শিক্ষা ডেস্ক: রফিকের বয়স তখন বড়জোর আট কি নয়। প্রতিদিন সকালে যখন তার বয়সি অন্য শিশুরা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে হইচই করতে করতে স্কুলের পথে হাঁটত, রফিক তখন বাবার সঙ্গে ইটের ভাটায় যেত। ধুলো আর ধোঁয়ায় তার ছোট্ট ফুসফুস প্রতিদিন একটু একটু করে বিষাক্ত হতো। অভাবের সংসার, যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে ছেলের হাতে বই-খাতা তুলে দেওয়ার কথা ভাবার অবকাশ রফিকের বাবার ছিল না।
কিন্তু একদিন রফিকদের গ্রামে বদলি হয়ে এলেন নতুন এক স্কুলশিক্ষক, আনিস স্যার। তিনি শুধু স্কুলেই পড়াতেন না, বিকালে গ্রামে গ্রামে ঘুরে খোঁজ নিতেন কেন বাচ্চারা স্কুলে আসছে না। একদিন ইটের ভাটায় রফিককে দেখে স্যারের মন কেঁদে উঠল। তিনি রফিকের বাবাকে অনেক বুঝিয়ে স্কুলের তরফ থেকে বিনা বেতনে পড়া এবং দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করে রফিককে স্কুলে নিয়ে এলেন।
আনিস স্যারের পড়ানোর ধরনটা ছিল অন্যরকম। তিনি শুধু বইয়ের পড়া মুখস্থ করাতেন না; তিনি গল্প বলতেন, বিজ্ঞানের ছোট ছোট ম্যাজিক দেখাতেন, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে শেখাতেন। রফিক জানতে পারল কেন খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া জরুরি, কেন ফুটানো পানি পান করতে হয়। স্কুলের সেই পরিবেশ রফিকের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা আত্মবিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলল।
আজ ২০ বছর পর সেই রফিক আর ইটের ভাটায় কাজ করে না। সে এখন একটি সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন সফল কৃষিবিদ। নিজের উদ্ভাবিত নতুন জাতের বীজ দিয়ে সে তার গ্রামের কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। রফিকের বাবা আজ গর্ব করে বলেন, ‘আমার ছেলেটা যদি ওইদিন স্কুলে না যেত, আজ হয়তো আমার মতোই অন্যের জমিতে বা ইটের ভাটায় ধুঁকে ধুঁকে মরত।’
এই যে একটিমাত্র প্রজš§ রফিকের বাবা থেকে রফিকÑএর মাঝেই পুরো পরিবারের, এমনকি পুরো গ্রামের একটি দৃশ্যপট বদলে গেল; এই জাদুর কাঠিটির নামই হলো ‘মানসম্মত শিক্ষা’ বা কোয়ালিটি এডুকেশন।
মানসম্মত শিক্ষা আসলে কী: আমাদের সমাজে একটা ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া বা প্রথম স্থান অধিকার করাই হলো ভালো শিক্ষার লক্ষণ। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা কেবল বইয়ের পাতায় বা পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। মানসম্মত শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা, যা একজন শিশুকে তার চারপাশের পরিবেশ বুঝতে সাহায্য করে। এটি তাকে কেবল অক্ষরজ্ঞান দেয় না, বরং তাকে শেখায়Ñকীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে সমস্যা সমাধান করতে হয়। যে শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর ভেতরে নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাস তৈরি করে, তাকে নিজের পূর্ণ সম্ভাবনার বিকাশে সাহায্য করে, তাকেই আমরা প্রকৃত বা মানসম্মত শিক্ষা বলতে পারি। এটি এমন একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা একটি পুরো সমাজকে মাত্র এক প্রজšে§র ব্যবধানে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে আলোর ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পারে।
দারিদ্র্য, শিশুশ্রম: রফিকের গল্পটি আমাদের একটি বড় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমাদের দেশে হাজারো শিশু দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে শিশুশ্রমের মতো বিপজ্জনক পথে পা বাড়াতে বাধ্য হয়। মানসম্মত শিক্ষা শিশুদের এই শোষণের হাত থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর রক্ষাকবচ।
যখন একটি শিশু মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পায়, তখন সে শুধু নিজেই শেখে না, তার পরিবারকেও সচেতন করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, স্কুলের স্বাস্থ্যবিষয়ক সাধারণ শিক্ষাগুলো একটি শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পুষ্টি এবং রোগব্যাধি প্রতিরোধের প্রাথমিক জ্ঞানগুলো যখন শিশুরা স্কুলে শেখে, তখন সমাজে ডায়রিয়া, কলেরার মতো পানিবাহিত রোগ বা অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধির হার জাদুকরিভাবে কমে যায়।
বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার কথা যদি বলি, এর প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী। একজন শিক্ষিত মা জানেন তার শিশুর জন্য কোন খাবারটি পুষ্টিকর, কখন টিকা দিতে হবে এবং কীভাবে অসুস্থতার সময় যত্ন নিতে হবে। পরিসংখ্যান বলে, যে সমাজে নারীরা মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পায়, সেখানে শিশুমৃত্যুর হার ও বাল্যবিয়ের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম থাকে। শিক্ষা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে, ফলে তারা সমাজের নানা ধরনের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস পায়।
উন্নত জাতি গঠনে মানসম্মত শিক্ষার ভূমিকা: একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মাটির নিচের তেল, গ্যাস বা কয়লা নয়; একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সে দেশের মানুষ। আর এই মানবসম্পদকে যোগ্য করে তোলার একমাত্র উপায় হলো শিক্ষা।
যে শিশুটি আজ স্কুলে যাচ্ছে, আগামী দিনে সে-ই হয়তো দেশের নেতৃত্ব দেবে, বড় কোনো শিল্পকারখানা চালাবে, বা হাসপাতালে মানুষের জীবন বাঁচাবে। মানসম্মত শিক্ষা শিশুদের ভেতরে নতুন কিছু করার স্পৃহা তৈরি করে। এটি তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে। যখন একটি দেশের তরুণ প্রজš§ দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী হয়, তখন সে দেশের অর্থনীতি এমনিতেই শক্তিশালী হতে বাধ্য।
তাছাড়া সুশিক্ষা মানুষের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা, সহানুভূতি এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করে। যে সমাজে শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের সংখ্যা বেশি, সেখানে অপরাধের হার কমে যায়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে এবং একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি জরুরি দিকনির্দেশনা: মানসম্মত শিক্ষার এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। যারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারণ করেন, তাদের জন্য নিচে কিছু বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী গাইডলাইন বা প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলোÑ
১. শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও যথাযথ মূল্যায়ন
শিক্ষকরা হলেন শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ। একটি ভবনে দামি বেঞ্চ বা প্রজেক্টর থাকলেই পড়ালেখা ভালো হয় না, যদি না সেখানে একজন যোগ্য শিক্ষক থাকেন। শিক্ষকতায় দেশের সেরা মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে হবে। এর জন্য শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন।
শুধু নিয়োগ দিলেই হবে না, শিক্ষকদের নিয়মিত এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিশুদের মনস্তত্ত্ব বোঝা এবং আনন্দদায়ক উপায়ে পাঠদানের পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের দক্ষ করে তুলতে হবে।
২. মুখস্থবিদ্যার বদলে প্রায়োগিক ও জীবনমুখী শিক্ষাক্রম: আমাদের পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম এমনভাবে সাজাতে হবে যেন তা বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়। পরীক্ষার খাতায় কে কত বেশি লিখতে পারল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবেÑকে কতটা শিখল এবং তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারল তার ওপর।
কর্মমুখী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং সফট স্কিলস (যেমন: যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা) পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হবে।
৩. নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরি: স্কুলগুলোকে শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক করে তুলতে হবে। ভয়ের পরিবেশ নয়, বরং ভালোবাসার পরিবেশে শিশুরা সবচেয়ে ভালো শেখে।
শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন শিশু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন ‘ইনক্লুসিভ এডুকেশন’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশুই যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, তা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে।
৪. পুষ্টি ও স্বাস্থ্য কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি: ক্ষুধার্ত পেটে কখনোই পড়াশোনা হয় না। তাই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ‘মিড-ডে মিল’ বা দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা আরও সুসংগঠিতভাবে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। স্কুলগুলোয় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা (কাউন্সেলিং) প্রদানের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৫. প্রযুক্তির সঠিক ও সুষম ব্যবহার: একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে খেয়াল রাখতে হবে, শহর ও গ্রামের স্কুলগুলোর মধ্যে যেন ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ তৈরি না হয়।
গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোতেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং কম্পিউটার ল্যাবের সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে।
৬. জবাবদিহিতা ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা: শিক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের প্রতিটি পয়সা যেন সঠিক খাতে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুলগুলোর শিক্ষার মান নিয়মিত তদারকি করার জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
পরিশেষে, মানসম্মত শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রতিটি শিশুর জš§গত অধিকার। রফিকের মতো লাখো শিশু প্রতিদিন আমাদের চারপাশে বেড়ে উঠছে। তাদের চোখে হাজারো স্বপ্ন। আমাদের দায়িত্ব হলো তাদের সেই স্বপ্নগুলোকে ডানা মেলার সুযোগ করে দেওয়া।
একটি বীজকে যদি সঠিক মাটি, আলো আর পানি দেওয়া হয়, তবে সে একদিন বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়ে সবাইকে ছায়া দেয়, ফল দেয়। আমাদের শিশুরাও এক একটি সম্ভাবনার বীজ। তাদের যদি আমরা মানসম্মত শিক্ষার আলো আর সঠিক নির্দেশনার জল দিয়ে বড় করতে পারি, তবে তারা শুধু নিজেদের জীবনই বদলাবে না, বরং তাদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক রাষ্ট্র।
আসুন, ভবিষ্যৎ প্রজšে§র জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যাওয়ার প্রত্যয়ে আমরা মানসম্মত শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগ করি। কারণ শিক্ষার চেয়ে বড় কোনো বিনিয়োগ নেই, আর একটি শিক্ষিত প্রজšে§র চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই।
