নিজস্ব প্রতিবেদক : পবিত্র রমজান মাসের প্রথম দিনেই রাজধানীর অলিগলি যেন রূপ নিয়েছে এক প্রাণচঞ্চল ইফতার বাজারে। মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি থেকে শুরু করে হালিম, কাবাব ও নান রুটির লোভনীয় সুগন্ধে মুখরিত চারদিক। বিকাল ৪চার পরপরই পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোয় ভিড় করছেন রোজাদাররাÑসাধ্যের মধ্যে পছন্দের ইফতারসামগ্রী কিনতে। রমজানের শুরুতেই এমন ব্যস্ততা আর আমেজে নগরজীবনে নেমেছে উৎসবের ছোঁয়া।
পবিত্র রমজানের সূচনাতেই পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চকবাজারে ইফতারপ্রেমীদের ঢল নেমেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসেছেন স্বাদ ও বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ ইফতারি উপভোগ করতে। প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো এই বাজার রোজার শুরুতেই রোজাদারদের অন্যতম আকর্ষণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় দেখা যায়, সড়কের দুই পাশে সারি সারি দোকান সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। ঐতিহ্যবাহী ইফতার সামগ্রীর পাশাপাশি সেখানে পাওয়া যাচ্ছে জিলাপি, ফিরনি এবং বিভিন্ন পদের ফল।
শুধু কারওয়ান বাজার নয়, খিলগাঁও, মুগদা, মালিবাগ ও মগবাজারসহ রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় একইভাবে বসেছে ইফতারের পসরা। নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্তÑসব শ্রেণি-পেশার মানুষকেই নিজের সাধ্য ও পছন্দ অনুযায়ী ইফতার সংগ্রহ করতে দেখা যায়। বিশেষ করে হালিম ও জিলাপির দোকানে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো।
এদিকে চকবাজারের সার্কুলার রোডে দেখা যায়, জোহরের নামাজের পরেই ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। হাঁকডাকে জমজমাট হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। ক্রেতারাও ভিড় জমাচ্ছেন দুপুর থেকেই। ইফতারের সময় যতোই গড়াচ্ছে, ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে।
সাধারণ পাড়া-মহল্লায় ছোলা, আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু ইফতারির দৈনিক উপকরণ হিসেবে বিক্রি হয়ে থাকলেও চকবাজারের ইফতারি বাজার কিছুটা আলাদা। এখানকার ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ যেমন বিখ্যাত, তেমনি রসনা বাড়াতে জুড়ি নেই প্রায় ১০০ রকম ইফতারির আইটেমেরও।
খাসির পা থেকে শুরু করে হরেক রকম ইফতারি পাওয়া যায়-এই চকবাজারে। এর মধ্যে রয়েছে চিকেন আচারি ১২০ টাকা, শাহি রুটি ৮০-১০০ টাকা, দই বড়া ৫ পিস ২০ টাকা, চিকেন সাসলিক ৮০ টাকা, চিকেন স্টেক ৮০ টাকা, চিকেন লেগপিস ৮০ টাকা, তান্দুরি চিকেন ১০০ টাকা, চিকেন বল ৬০ টাকা, চিকেন বান ৪০ টাকা, শর্মা ৪০ টাকা, চিকেন টোস্ট ৬০ টাকা, ডিম চপ ২০ টাকা, শাহি পরোটা ৬০-৮০ টাকা, খাসির লেগপিস ৯০০ টাকা, কোয়েল পাখি পিস ৯০ টাকা, টিকা ১০-৩০ টাকা, সমুচা ২০ টাকা, সুতি কাবাব কেজি ১ হাজার ৬০০ টাকা, নিমকি ২০ টাকা, শাহি জিলাপি কেজি ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ছোলা, মুড়ি, আলুর চপ, বেগুনি, পেঁয়াজু, ঘুঘনি পাওয়া যায়, যা বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ২০ টাকার মধ্যেই।
চকবাজারের অন্যতম আকর্ষণ বড় বাপের পোলায় খায় প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। সামনে গেলেই শোনা যায় সে মজার ছন্দের ডাক, ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’, ‘ধনী-গরিব সবাই খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়’।
বড় বাপের পোলায় খায় মূলত মাংস, কাবাব, ডিম, ঘি, বুটের ডাল, মাংসের কিমা ও নানা ধরনের মসল্লা দিয়ে তৈরি করা হয়। বৈচিত্র্যময় স্বাদের জন্য রোজাদারদের আগ্রহের লিস্টে থাকে এ খাবারটি।
ওইখানের এক বিক্রেতা তিনি বলেন, বড় বাপের পোলায় খায় চকবাজারের জনপ্রিয় ইফতারি আইটেম। ঢাকার নানা জায়গা থেকে মানুষ এই খাবার কিনতে চকবাজারে আসেন। ১২ রকমের আইটেম ও মসল্লাসহ এইটা তৈরি করা হয়। গত বছরের মতো এবারেও প্রতি কেজি ৮০০ টাকাতে বিক্রি হচ্ছে।
আরেক বিক্রেতা বলেন, এবারে রোজার প্রথম দিনেই বাজার জমজমাট হয়ে উঠেছে। আশা করছি, এমনই থাকবে। আর আমরাও মানসম্মত ইফতারি বিক্রি করার চেষ্টা করে থাকি।
চকবাজারের বেশিরভাগ ইফতার বিক্রেতা বংশ পরম্পরায় এখানে ব্যবসা করছেন। তবে তাদের পাশাপাশি মৌসুমি ব্যবসায়ীও রয়েছেন, যারা শুধু রমজান মাসেই এখানে ইফতারি বিক্রি করেন। তবে এখানকার ক্রেতারা শুধু পুরান ঢাকার নয়, বরং ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজনও ইফতারির স্বাদ নিতে এখানে আসেন।
এক ক্রেতা বলেন, প্রতি বছর রোজা এলে চকবাজার থেকে ইফতার কিনে থাকি। আজ প্রথম রোজা, ভাবলাম এখান থেকেই আজ ইফতার কিনি, তাই এলাম।
মুগদার এক বাসিন্দা বলেন, চকবাজারের মূলত আসা হয় বিভিন্ন রকম মুখরোচক ইফতারি আইটেমের জন্য, যা হয়তো সচরাচর অন্যান্য জায়গায় পাওয়া যায় না। তব বেশিরভাগ ইফতার খোলা রেখে বিক্রি করা হয়, এ বিষয়ে বিক্রেতাদের সচেতন হওয়া উচিত।
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post