তৌহিদুল ইসলাম চঞ্চল : একটা সময় ছিল যখন সমাজের ও সম্পর্কের প্রাধান্য ছিল রাজনীতির ঊর্ধ্বে। রাজনৈতিক ভিন্নমত ছিল একটি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর বিষয়। যেখানে একই পরিবারের সহোদর দুই ধরনের রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী থাকলেও রাতে খাবার টেবিলে রাজনীতি চর্চা হলেও তা ছিল গঠনমূলক সমালোচনায় সীমাবদ্ধ। সাধারণত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এর ফলে বিভেদ সৃষ্টি না হয়ে পারস্পরিক সহাবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ঘরে ও বাইরে বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। রাজনীতির চেয়েও মানুষের রক্ত ও আত্মীয়তার টান ছিল শক্তিশালী। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই আদর্শিক রাজনীতির জায়গায় জেঁকে বসেছে ক্ষমতার লালসা এবং সামাজিক বিভাজন।
একতা থেকে স্বপ্নভঙ্গ ও স্বৈরাচারের আবির্ভাব-১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর এ দেশের মানুষের মধ্যে এক অভূতপূর্ব একতা সৃষ্টি হয়েছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা মানুষকে শিখিয়েছিল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ কীভাবে গড়তে হয়। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই তৎকালীন সরকারের নানা স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত সেই একতাকে ম্লান করতে শুরু করে। বিশেষ বাহিনী হিসেবে ‘রক্ষীবাহিনী’ গঠন এবং তাদের অগণতান্ত্রিক কার্যক্রম জনমনে ভীতির সঞ্চার করে। বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসনের রূপরেখা চূড়ান্ত করা, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং চারটি বাদে জাতীয় সব দৈনিক সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে প্রথম বড় ধাক্কা দেয়। পরবর্তীতে ১৯৭৫-এর ৭ই নভেম্বরের সিপাহী-জনতার বিপ্লব ছিল একদিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম, অন্যদিকে ক্ষমতার পালাবদলের এক জটিল সমীকরণ। এরপর আশির দশকে আমরা দেখি সামরিক স্বৈরাচারের আবির্ভাব, যেখানে রাজনৈতিক কূটচালে দীর্ঘায়িত করা হয় স্বৈরশাসনের মেয়াদ। রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভক্ত করা এবং ক্ষমতার মোহে আদর্শ বিসর্জন দেওয়ার সংস্কৃতি তখনই প্রকট হয়ে ওঠে।
অস্থিতিশীলতা ও শঙ্কার রাজনীতি- পরবর্তীতে আমরা দেখেছি রাজনীতির মাঠে এক ভয়াবহ ও নৃশংস রূপ। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার মতো ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্র ও নিরাপত্তার ওপর চরম অনাস্থা তৈরি করে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর লগি-বৈঠা দিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে পিটিয়ে মানুষ হত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনাটি এ দেশের সামাজিক মূল্যবোধের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। এই নৃশংসতা কেবল রাজনীতিকেই কলুষিত করেনি, বরং সাধারণ মানুষের সামাজিক জীবনে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। রাজপথে লাশের ওপর নৃত্যের মতো অমানবিক দৃশ্যগুলো মানুষের মনস্তত্ত্বকে বিষিয়ে তোলে, যার ফলে দীর্ঘদিনের সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বিলীন হয়ে এক হিংস্র ও প্রতিহিংসামূলক সংস্কৃতির জন্ম হয়। ঘরে ও বাইরে যে নির্ভয় পরিবেশ ছিল, তা বিষয়ে ওঠে এক অজানা আতঙ্কে, যা সমাজ ব্যবস্থাকে আরও ভঙ্গুর করে তোলে এবং এক-এগারোর মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পথ প্রশস্ত করে।
এক-এগারো ও রাজনীতির বিচ্যুতি- এক-এগারোর তথাকথিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনীতিক বিকেন্দ্রীকরণের নামে বিরাজনীতিকরণের যে প্রয়াস চালানো হয়, তা ছিল সুদূরপ্রসারী এক চক্রান্তের অংশ। প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে প্রভু মেনে যখন স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থের জন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনীতিবিদরা অবস্থান নেন, সেই রাষ্ট্রে আর রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সমাজ ব্যবস্থা যে ব্যালান্সড থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। এর ফলেই শুরু হয় বিচার বিভাগকে দলীয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি। বেগম খালেদা জিয়াকে জিয়া ওরফানেজ ট্রাস্টের একটি ভিত্তিহীন মামলায় যখন কারাগারে প্রেরণ করা হয়, তখন তা কেবল একজন নেত্রীর কারাবরণ ছিল না, বরং তা ছিল দেশের প্রধান বিরোধী পক্ষকে নির্মূল করার এক অগণতান্ত্রিক সূচনা।
ভয়ের সংস্কৃতি ও সামাজিক মেরুকরণ- বিগত দেড় দশকে সমাজ ও রাষ্ট্রের মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় চরমে পৌঁছেছে। শাহবাগী প্রেসার গ্রুপ কর্তৃক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রদত্ত রায়কে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমাজে একটি গভীর বিভাজন তৈরি করা হয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কিছু কালো আইনের মাধ্যমে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। যারা রাষ্ট্রের অনিয়ম নিয়ে কথা বলেছেন, সেই ‘হুইসেল ব্লোয়ার’দের জেলে বন্দি করা হয়েছে কিংবা গুম-খুনের শিকার হতে হয়েছে। দেশপ্রেমিক আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে হত্যা এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে বিরোধী মতকে দমন-পীড়ন বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। প্রতিটি সচেতন মানুষ এই সময়টাতে নিজেকে চরম অনিরাপদ অনুভব করেছেন এবং অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছেন। এর ফলে সামাজিক ও পারিবারিক আস্থার জায়গায় এমন ধস নেমেছে যে, মানুষ নিজের আপন ভাইকেও বিশ্বাস করতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে।
সাংস্কৃতিক ও ডিজিটাল আগ্রাসন- এই অবক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করেছে এক শ্রেণির সাংস্কৃতিক কর্মী ও সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে নগ্ন্ন ব্যবহার। শিল্প-সংস্কৃতির ধারক-বাহক হওয়ার বদলে যখন তারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রচারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে সংস্কৃতির শুদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা অনেক সময় অর্থের বিনিময়ে বা ক্ষমতার প্রভাবে সত্যকে আড়াল করে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়েছেন। এটি সামাজিক সম্পর্কে বিষক্রিয়া ঘটিয়েছে; কারণ মানুষ এখন বিনোদন বা তথ্যের উৎসের মধ্যেও রাজনৈতিক মেরুকরণ খোঁজে।
বিডিআর হত্যাকাণ্ড থেকে আয়নাঘর- ২০০৯ পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে ফাটল ধরে, তার শুরুটা ছিল পিলখানা বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। সেনাবাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সমাজের নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দেয়। এরপর ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা ছিল ভিন্নমতের ওপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের এক ভয়াবহ উদাহরণ। গণতান্ত্রিক একটি দেশে দীর্ঘদিন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না থাকা সাধারণ মানুষের মধ্যে যে হাহাকার তৈরি করেছে, তার বিষফল আমরা বিগত দেড় দশকে দেখেছি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহারের ফলে শুরু হয় প্রভু ও ভৃত্যের এক শোষণের খেলা। গুম, খুন আর ‘আয়নাঘর’ নামক গোপন কারাগারগুলো ছিল এই শাসনের প্রতীক। প্রহসনের একের পর এক নির্বাচনের মাধ্যমে যখন মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হলো, তখন জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তি পুরোপুরি ভেঙে পড়ল।
২০২৪-এর বিপ্লব ও মব জাস্টিস- দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, রাজনৈতিক বঞ্চনা আর শোষণের এই পাহাড় যখন আর সইবার মতো ছিল না, তখনই রাজপথে নেমে আসে দেশের তরুণ প্রজন্ম। জুলাই থেকে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন আগস্টে এসে রূপ নেয় এক গণঅভ্যুত্থানে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের লেলিয়ে দিয়েও যখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করা গেল না, তখন শুরু হলো এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। কিন্তু শোষণের সেই খেলা আর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা আর মুক্তির নেশায় মত্ত ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে পতন ঘটায় সেই দুঃশাসনের। দীর্ঘ দেড় দশকের সেই অন্ধকার শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট, যার পরিসমাপ্তি হয় রক্ত ও জীবন দিয়ে।
তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ‘মব’ (গড়ন) একটি বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়। মাজার ভাঙা, আদালত প্রাঙ্গণে বন্দীদের হেনস্তা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াসহ ওসমান হাদির মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো সমাজকে আবার ভাবিয়ে তোলে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সার এসব কর্মকাণ্ডকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে উৎসাহিত করছেন, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। বিপ্লবের অর্জনকে কালিমালিপ্ত করার এই প্রচেষ্টা সমাজে নতুন করে অস্থিরতা ও অনিরাপত্তার সৃষ্টি করছে। এটি প্রমাণ করে যে, কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, বরং মানসিকতার পরিবর্তনও আজ সময়ের দাবি।
আগামীর প্রত্যাশা: একটি নতুন ভোরের অঙ্গীকার-৫ আগস্টের রক্ত আর আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না যদি আমরা একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি। সমাজ বিনির্মাণের প্রতিটি সূচকে নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের প্রতিফলন ঘটিয়ে আমাদের আগামীর লক্ষ্য হওয়া উচিত:
- রাজনৈতিক সহাবস্থান ও ঐক্য: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিহিংসা ভুলে সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একতাবদ্ধ হওয়া আজ সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
- ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সুষম বণ্টন: ক্ষমতাকে কেবল কেন্দ্রের হাতে না রেখে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এটিই একমাত্র কার্যকর উপায়।
- প্রতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা: বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আইনের শাসন যেন সবার জন্য সমান হয়।
- তথ্য বিভ্রাট ও ইতিহাস পুনরুদ্ধার: প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যে সুপরিকল্পিত তথ্য বিভ্রাট ও বিকৃত ইতিহাস ছড়ানো হয়েছে, তা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে বের করে সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
- ঘৃণার বাষ্প নিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ সংস্কৃতি: ‘মিস-ইনফো’ ও ‘ডিস-ইনফো’ যা সমাজে ঘৃণা ছড়ায়, তা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সাংস্কৃতিক কর্মী ও ইনফ্লুয়েন্সারদের দলীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি বন্ধ করে সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে।
- মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইন চিরতরে রদ করে নির্ভয়ে কথা বলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মব কালচার বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করে বিচারহীনতার অবসান ঘটাতে হবে।
কলামিস্ট, মানবসম্পদ প্রশিক্ষক
