Print Date & Time : 26 March 2026 Thursday 12:18 pm

রাজশাহীতে মৌসুমি চাহিদার ফাঁদে শিল্প অর্থনীতি

আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী : ঈদুল ফিতরের আনন্দময় দিনগুলো শেষ হতে না হতেই রাজশাহীর শিল্প খাত যেন হঠাৎ করেই এক গভীর স্থবিরতায় ডুবে গেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যেখানে কারখানাগুলোয় দিন-রাত অবিরাম উৎপাদন চলছিল, শ্রমিকরা অতিরিক্ত সময় কাজ করে অর্ডারের চাপ সামলাচ্ছিলেন, সেখানে এখন অনেক মেশিন বন্ধ, হলঘর ফাঁকা, শ্রমিকের সংখ্যা কমে গেছে এবং নতুন অর্ডারের খোঁজ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এই ‘নীরব ধস’ বিশেষ করে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্ক শিল্প এবং বিসিক শিল্পনগরীর ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প ইউনিটগুলোকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে। উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের মতে, এটি কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং মৌসুমি চাহিদার ফাঁদে পড়ে থাকা শিল্প অর্থনীতির একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রকাশ।

রাজশাহী শহরের সাপুরা, কাশিয়াডাঙ্গা এবং বিসিক এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের আগের কর্মচাঞ্চল্য এখন পুরোপুরি উধাও রাজশাহী সিল্ক ফ্যাক্টরি, উসা সিল্ক ফ্যাক্টরি, সপুরা সিল্ক মিলসসহ একাধিক কারখানায় এখন আংশিক উৎপাদন চলছে। অনেক ইউনিটে মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ মেশিন চালু রয়েছে। কারখানা মালিকরা জানান, ‘ঈদের আগে অর্ডারের চাপ এত বেশি থাকে যে আমরা রাত-দিন কাজ করি। কিন্তু ঈদের পর নতুন অর্ডার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমাতে হয়, শ্রমিকদের কাজের সময় কমিয়ে দিতে হয়।’

সিল্কশিল্পের মৌসুমি বন্দিদশা

রাজশাহীর সিল্কশিল্প দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী খাত। এখানকার রেশমি শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস ও অন্যান্য পণ্য একসময় দেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সেরিকালচার বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এই খাত এখনো পুরোপুরি মৌসুমি চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। বছরে মূলত দুটি বড় মৌসুম ঈদ এবং বিয়ের সিজনের সময়েই ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিক্রি হয়। বাকি সময় উৎপাদন অনেকাংশে কম থাকে।

একজন বোর্ড কর্মকর্তা বলেন, ‘ঈদের আগে কারখানাগুলোয় উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। শ্রমিকরা অতিরিক্ত ঘণ্টা কাজ করেন। কিন্তু ঈদ শেষ হলে বাজার একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়। যতক্ষণ না আমরা রপ্তানি বাজার বাড়াতে পারছি বা সারা বছরের চাহিদা তৈরি করতে পারছি, ততক্ষণ এই মৌসুমি নির্ভরতা কাটানো সম্ভব হবে না।’

বর্তমানে সিল্ক সুতার উৎপাদনও চ্যালেঞ্জের মুখে। স্থানীয় কোকুন থেকে উৎপাদিত সুতার পরিমাণ খুব কম, ফলে অনেক কারখানা চীন ও ভারত থেকে আমদানিকৃত সুতা ব্যবহার করছে। এতে ঐতিহ্যবাহী ‘রাজশাহী সিল্ক’-এর আসল পরিচয়ও কিছুটা হারিয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা জানান, ঈদের সময় বিক্রি বাড়লেও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, রং-কেমিক্যাল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। বাজারে পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়ানো যায়নি।

বিসিক শিল্পনগরীতে উৎপাদন অর্ধেক

রাজশাহীর শিল্প খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলো বাংলদেশ স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিক) শিল্পনগরী। এখানে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, কুটিরশিল্পসহ শতাধিক ইউনিট রয়েছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের পর অনেক কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে গেছে। কোনো কোনো ইউনিটে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।

একজন বিসিক উদ্যোক্তা বলেন, ‘ঈদের আগে যা বিক্রি হয়, সেটার ওপরই আমাদের পরবর্তী কয়েক মাস নির্ভর করতে হয়। এখন বাজারে ক্রেতা নেই, নতুন অর্ডার নেই, ফলে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে। শ্রমিক ছাঁটাই না করলেও কাজের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক শ্রমিককে অর্ধেক দিন কাজ করতে বলা হচ্ছে।’

এখানকার কারখানাগুলোয় খাদ্যদ্রব্য, প্লাস্টিক পণ্য, হালকা যন্ত্রাংশ ও হস্তশিল্পজাত পণ্য উৎপাদন হয়। ঈদের আগে এসব পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু ঈদের পর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিক্রি একেবারে তলানিতে ঠেকেছে।

ঈদের আগে রাজশাহীর শিল্প খাতে শ্রমিক সংকট ছিল। অনেক কারখানায় অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু ঈদের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টে গেছে। এখন অনেক শ্রমিক কাজহীন হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা সিল্ক কারিগর ও ক্ষুদ্র শিল্পের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।একজন সিল্ক কারিগর জানান, ‘ঈদের আগে কাজের চাপ এত বেশি ছিল যে আমরা রাত জেগে কাজ করতাম। এখন কারখানায় গিয়ে দেখি মেশিন বন্ধ। বসে থাকতে হয়। অন্য কাজ খুঁজতে হচ্ছে। পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

এই কাজ সংকট শহরের নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। অনেক শ্রমিক ঈদের আগে ধার-দেনা করে পরিবারের জন্য খরচ করেছেন। এখন আয় কমে যাওয়ায় ঋণ শোধ করা এবং দৈনন্দিন খরচ চালানোÑদুটোই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও লাভ কমে যাওয়া

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া আরেকটি বড় সমস্যা। সিল্ক সুতা, রং ও কেমিক্যাল, বিদ্যুৎ বিল, জ্বালানিÑসবকিছুর দামই ঈদের আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু বাজারে পণ্যের দাম সেই হারে বাড়ানো যায়নি। ফলে ঈদের সময় বিক্রি বাড়লেও প্রকৃত লাভ অনেক কম হয়েছে।

একজন উদ্যোক্তা বলেন, ‘ঈদের আগে আমরা অনেক পণ্য তৈরি করি। কিন্তু খরচ বেশি হওয়ায় লাভের মার্জিন খুব সামান্য। ঈদের পর তো বিক্রিই নেই। এভাবে চলতে থাকলে অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।’

বাজারে নগদ সংকট ও চাহিদা হ্রাস

ঈদের পর রাজশাহীর বাজারে নগদ অর্থের সংকট স্পষ্ট। মানুষ ঈদে পোশাক, খাবার, উপহার ইত্যাদিতে বেশি খরচ করেছেন। অনেকে ধার বা ঋণ নিয়ে ঈদ উদ্যাপন করেছেন। ফলে পরবর্তী সময়ে তাদের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। সাহেববাজার, শিরোইল বা অন্যান্য বাজারের দোকানিরা জানান, ‘ঈদের আগে দোকানে ভিড় লেগে থাকত, এখন পুরো ফাঁকা। শিল্পপণ্যের চাহিদা একেবারে কমে গেছে।’