আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী: রাজশাহীতে সরকারি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে এক ধরনের জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি হিসাব বলছে, পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য মজুত আছে। সরকারি বরাদ্দও নিয়মিত। তবুও বাজারে দামের অস্থিরতা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তিতে অভিযোগ রয়েছে। খাদ্যব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে সমন্বয়হীনতা, অদক্ষতা ও অভিযোগের একটি জটিল কাঠামো তৈরি হয়েছে। বিষয়টি অর্থনৈতিক ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমন মৌসুমে রাজশাহী বিভাগে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, সিদ্ধ চাল, আতপ চাল ও ধানের সংগ্রহ চলছে নিয়মিত। জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা লোকাল স্টোরেজ ডিপো (এলএসডি) এবং সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপো (সিএসডি) মিলিয়ে খাদ্য সংরক্ষণের বিস্তৃত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। জাতীয় পর্যায়ে সরকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি বৃদ্ধি করছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারের পরিস্থিতি এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ নয়। এই প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ের তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে ‘লিকেজ’ এবং সমন্বয়ের অভাব খাদ্য ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, রাজশাহী বিভাগে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল ও গম সরকারি ব্যবস্থাপনায় সংগ্রহ ও মজুত করা হয়। ২০২৫-২৬ আমন মৌসুমে রাজশাহী বিভাগের জন্য ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে দৈনিক মজুত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে এলএসডি ও সিএসডি গুদামের স্টক দেখানো হয়। সরকারি হিসাবে মৌসুমভিত্তিক ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভিজিএফ, ভিজিডি প্রভৃতির মাধ্যমে বিতরণ অব্যাহত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক মজুত রাখা হয়।
তবে সাম্প্রতিক তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, গুদামে মজুত খাদ্যের পরিমাণ কাগজে যতটা দেখানো হয়, বাস্তবে তার প্রভাব বাজারে পড়ছে না। জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের লক্ষ্য ২ দশমিক ৩১ মিলিয়ন মেট্রিক টন চালের মতো, কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিতরণের গ্যাপ রয়েছে।
রাজশাহীর সাহেববাজার, কোর্ট বাজার, নওদাপাড়া ও বিনোদপুরসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, চালের দাম স্থিতিশীল নয়। হঠাৎ করে দাম বেড়ে যায়। পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামের ব্যবধান বাড়ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সরকারি গুদামে চাল থাকলেও বাজারে তার প্রভাব সবসময় পড়ে না। সরবরাহের মধ্যে কোথাও একটা গ্যাপ থাকে। তাদের দাবি, সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যবর্তী পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ সমস্যা, পরিবহন বিলম্ব এবং ডিলার পর্যায়ে অনিয়ম।
একজন পাইকারি ব্যবসায়ী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, গুদাম থেকে চাল ছাড়ার পর ডিলার ও পরিবহনের মাধ্যমে বাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে। এতে দামের ওঠানামা হয়। বাজারদরের এই অস্থিরতা নিম্নআয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। বিবিএসের তথ্য অনুসারে, খাদ্য নিরাপত্তা সূচক উন্নতির দিকে গেলেও মাইক্রো লেভেলে এর প্রতিফলন কম।
সরকার প্রতিবছর কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে ধান সংগ্রহের ঘোষণা দেয়। উদ্দেশ্য কৃষককে ন্যায্যমূল্য দেয়া এবং বাজার স্থিতিশীল রাখা। কিন্তু রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, মোহনপুর ও পবা উপজেলার বিভিন্ন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই সরাসরি সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রি করতে পারেন না। তালিকাভুক্ত প্রক্রিয়ায় জটিলতা রয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগী ও মিলারদের প্রভাব বেশি।
একজন কৃষক (তানোর উপজেলা) বলেন, সরকারি দামে ধান দিতে গেলে অনেক ঝামেলা। তাই কম দামে বাজারেই বিক্রি করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত মূল্য কৃষকের কাছে পুরোপুরি পৌঁছায় না, যা কৃষি অর্থনীতির জন্য একটি বড় সংকেত। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ধান সংগ্রহের দাম নির্ধারিত হলেও কৃষকরা বলছেন, বাস্তবে তারা ২০-৩০ টাকা কম দাম পাচ্ছেন। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, ফলে ভবিষ্যতে ধান চাষে আগ্রহ কমতে পারে।
অন্যদিকে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য চালু থাকা ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সরকারি হিসাবে নির্ধারিত দামে চাল বিক্রি করা হয় এবং নির্দিষ্ট কার্ডধারীরা মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল পান। কিন্তু বাস্তবে অনেক ভোক্তা জানিয়েছেন, লাইনে দাঁড়িয়েও চাল পাওয়া যায় না, বরাদ্দ কম পড়ে এবং নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
একজন সুবিধাভোগী (নওদাপাড়া এলাকা) বলেন, কার্ড আছে, কিন্তু সবসময় চাল পাই না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এক ডিলার বলেন, যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা দিয়ে সবার চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির তালিকায় রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু বিতরণে অসমতা রয়েছে।
এদিকে, খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থায়ও একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানা য়ায়। স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য মজুত থাকে, সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে মানের অবনতি ঘটে এবং পর্যাপ্ত মনিটরিং না থাকলে অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। ২০২৫ সালে রাজশাহীর কয়েকটি গুদামে নিম্নমানের চাল পাওয়ার ঘটনা এই অদক্ষতার প্রমাণ।
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দাবি করেন, গুদাম ব্যবস্থাপনা নিয়ম মেনে পরিচালিত হয় এবং নিয়মিত পরিদর্শন করা হয়। তবে মাঠপর্যায়ের তথ্য এই ব্যবস্থায় আরও উন্নতির প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।
জানা যায়, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পরিবহন। গুদাম থেকে ডিলার পর্যন্ত খাদ্য পৌঁছাতে বড় আকারের পরিবহন নেটওয়ার্ক কাজ করে। স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন টেন্ডারে সীমিত কিছু গ্রুপ প্রভাবশালীদের অগ্রাধিকার এবং এরই সঙ্গে যোগ হয়েছে অধিক পরিবহন ব্যয় এবং সময়মতো সরবরাহে বিলম্ব।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একজন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ম মেনে হয়, কিন্তু বাস্তবে পরিবহন খরচ এবং সময়সূচি মেনে চলতে গিয়ে চাপ পড়ে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সব টেন্ডার সরকারি নিয়ম অনুযায়ী করা হয়। এতে কোনো প্রকার অনিয়ম করা হয় না! কিন্তু, তিনি আরও যোগ করে বলেন, কিছু ক্ষমতাধর রয়েছেন তাদের কাছে আমরা ভিড়তে পারি না।
অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘লিকেজ’, অর্থাৎ নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে সম্পদের অপসারণ। রাজশাহীতেও স্থানীয়ভাবে এমন অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাল খোলা বাজারে দেখা যায়, ডিলার পর্যায়ে হিসাবের অমিল এবং বরাদ্দের তুলনায় কম বিতরণ।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি, এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ধরনের অভিযোগ স্বীকার করেননি।
রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহন আহমেদ (ভারপ্রাপ্ত, আ. দা.) জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তারা প্রত্যেকটি কাজ বাস্তবায়ন করেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কোনো কিছু পরিবর্তন করার এক্তিয়ার তাদের নেই, তবে মনিটরিং এবং অন্যান্য বিষয়ে তারা সচেতন। খাদ্য অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কর্মকর্তারা বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হয় এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা সূচক উন্নতির দিকে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, নিম্নআয়ের মানুষ পুরো সুবিধা পাচ্ছে না, বাজারদরের চাপ বাড়ছে এবং কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। অর্থাৎ ম্যাক্রো লেভেলের উন্নতি মাইক্রো লেভেলে পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা একটি বহুস্তরীয় চেইন। এখানে প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তারা আরও বলেন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা জরুরি, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ বাড়াতে হবে এবং ডিলার ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে কৃষকের উৎপাদনে আগ্রহ কমে যাওয়া, বাজারে মূল্য অস্থিরতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়া। বিশেষ করে কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য না পান, তাহলে ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে যেতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলবে। শেয়ার বিজ-এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সংকট পুঁজিবাজারে কৃষি-সম্পর্কিত কোম্পানি এবং সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সর্বশেষ এ নিয়ে রাজশাহী পুরোনো খাদ্য সরবরাহকারী ব্যক্তিরা বলেন, রাজশাহীর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো। কাগজে খাদ্য মজুত থাকলেও যদি তা সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে সেই ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, এ খাতে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার। অন্যথায় ‘গুদামভরা খাদ্য’ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

Print Date & Time : 18 April 2026 Saturday 5:11 am
রাজশাহীর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় অদৃশ্য সংকট
শীর্ষ খবর ♦ প্রকাশ: