এফ আই মাসউদ: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে। উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, আমদানি কমে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপÑসব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়ে। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা, অর্থাৎ লক্ষ্য থেকে প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি।
অর্থবছরের বাকি চার মাসে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা আদায়ের বড় চাপ তৈরি হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহ প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মাসেই আদায় ৪০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেনি। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বাজেট বাস্তবায়নও চাপের মুখে পড়বে বলে মনে করেন তারা।
সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও (প্রায় ১২ শতাংশ) তা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যথেষ্ট নয়। আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্কÑতিনটি প্রধান খাতের কোনোটিই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা গেছে আয়কর খাতে।
এদিকে করদাতাদের একটি বড় অংশ এখনও রিটার্ন দাখিল করছেন না। প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএনধারীর মধ্যে মাত্র ৪৬ লাখ রিটার্ন জমা দিয়েছেন, যা মোটের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কমপ্লায়েন্স ঘাটতি রাজস্ব আদায়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট টিআইএনধারীর প্রায় ৬৪ শতাংশই রিটার্ন দাখিল করেননি, যদিও সময়সীমা চার দফা বাড়ানো হয়েছিল। দাখিলকৃত ৪৬ লাখ রিটার্নের মধ্যে প্রায় ৪২ লাখ ৯৭ হাজার অনলাইনে এবং ৩ লাখ ৪ হাজার কাগজে জমা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কোম্পানির রিটার্ন রয়েছে। আগের অর্থবছরে রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা ছিল ৪২ লাখ ৫০ হাজার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, যেখানে রাজস্ব আয় ছিল ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা, অর্থাৎ ব্যয় আয়কে ছাড়িয়ে গেছে।
চলতি অর্থবছরেও একই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন খাতে অর্থ স্থানান্তর করতে হয়েছে। শুধু বেতন-ভাতা বাবদই অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বেড়ে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ঘাটতি সামাল দিতে উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হওয়ায় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের যে পরিমাণ পার্সোনাল আইডেন্টিফিকেশন নম্বরধারী (পিন) আছে, আর যে পরিমাণ রিটার্ন সাবমিশন করে, তার মধ্যে কিন্তু একটা বিস্তর ফারাক আছে। অনেক কিছু লেনদেন হয় নগদে, যেটা ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। ব্যাংকিং চ্যানেলে যদি নিয়ে আসে, অনলাইনে প্রত্যেকের জন্য ট্যাক্স সাবমিশন ম্যান্ডেটরি করে দেয়, তাহলে এই জায়গাগুলো এবং একটা সেন্ট্রাল ডেটাবেস যদি থাকে, ক্যাশলেস সোসাইটি থেকে যদি পাওয়া যায়, সবগুলো যদি ডিজিটাল ব্যাংকিং বা অনলাইন সিস্টেমে হয়Ñতখন কিন্তু প্রতিটি পয়সার চ্যানেলের ট্র্যাকিং থাকে। তার ভিত্তিতে প্রপারলি সবাই সব ধরনের কর দেয় কি না, সেটা চেক করার একটা ব্যবস্থা থাকবে। সেজন্য আমি মনে করি, করের নেট না বাড়িয়ে এক্সিস্টিং ব্যবস্থার মধ্যেই যেগুলো হয়, সেগুলোকে ওভারকাম করতে হবে। যেমন বিভিন্ন করপোরেটের বড় বড় ফাইল আছে। ট্যাক্সের ক্ষেত্রে একটা বিষয় হলো কিছু অসাধু কর্মকর্তা এটাকে একটা সেটেলমেন্ট করে। এতে সরকারের ঘরে কম টাকা জমা পড়ে। ওই ব্যক্তি হয়তো কিছু সুবিধা পায়। আর যার ট্যাক্স ইমপোজ করা হয়, তাকে হয়তো অল্প ট্যাক্স নিয়ে একটা দায়মুক্তি দেওয়া হয়। তাহলে এখানে তিনটা পার্টি বেনিফিট হলো, ক্ষতিগ্রস্ত হলো সরকার। সেজন্য আসলে এই জিনিসটাকে আর কি আমি মনে করি যদি প্রপারলি করতে পারে, তাহলে হয়তো সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাটা হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এম হেলাল আহম্মেদ খান শেয়ার বিজকে বলেন, রাজস্ব ঘাটতি রেখে বাজেট প্রণয়ন করা নতুন কিছু নয়; প্রতি অর্থবছর এটি করা হয়ে থাকে। তবে এর প্রভাব নির্ভর করে ঘাটতির পরিমাণ, অর্থায়নের উৎস এবং অর্থনীতির অবস্থাÑ এই তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। তবে আগামী অর্থবছরে বাজেটের আকারের যে পূর্বাভাস এবং রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা, তা বাস্তবায়ন করা খুব চ্যালেঞ্জিং হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ডাবল ডিজিটে পৌঁছার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণত বাজেটের আকার বাড়লে টাকার সরবরাহ বেড়ে যায়।
সাবেক সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান বদিউর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, রাজস্ব ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারপ্রধান যদি সরাসরি বলে যে আমার দলের হোক, আমার মন্ত্রী হোক, যে-ই হোকÑনিয়মমাফিক যত ট্যাক্স পাবে, সেটা ধরবেন। ড. ইউনূস ক্ষমতায় থাকার সময় ট্যাক্স মাফ করে নিয়েছেন, সেটা কি তিনি পারেন? তার আগে তিনি (ইউনূস) হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট করছেন ট্যাক্স মাপের জন্য। সে সময় তিনি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট হেরে ট্যাক্স দিয়েছেন। তিনি গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা কর মাফ করে নিয়েছেন। এ ধরনের অরাজকতা হলে ঘাটতি থাকবে। যদি সরকার এটাতে আরও সতর্ক না হয়, তাহলে দুর্নীতি অনেক বেশি পরিমাণে ছড়িয়ে যাবে।
তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের সর্বশেষ ৩০ নভেম্বর হলেও বারবার সময় বাড়ানো হলে মানুষ তা মানবে না। আয়কর জমা দেওয়ার সময় বারবার বাড়ানো অযৌক্তিক বলে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, যখন প্রাকৃতিক সমস্যা বা দুর্যোগ এবং যুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটলেই কেবল সময় বাড়ানো যেতে পারে। অন্যথায় মাসের পর মাস সময় বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ দু-চার মাস পরপর সময় বাড়ালে তো মানুষ বিষয়টি আমলে নেবে না। এতে এনবিআরের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। কারণ ট্যাক্স সংগ্রহণের জন্য আপনার যে ‘মুরদ নেই’ তা প্রমাণ করে। এজন্য এনবিআরকে আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
আইনের প্রয়োগ দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যিনি চেয়ারে থাকবেন, এমডি বা চেয়ারম্যানের পদে তাকে অব্যশই ন্যায়নিষ্ঠাবান হতে হবে। পাশাপাশি সরকার তাকে কতটুকু সাপোর্ট দেয়, সেটাও দেখতে হবে।

Print Date & Time : 17 April 2026 Friday 11:46 am
রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চরম অনিশ্চয়তা
শীর্ষ খবর ♦ প্রকাশ: