Print Date & Time : 13 January 2026 Tuesday 11:20 pm

রাজস্ব আহরণ ডিজিটাল হলে কর ফাঁকি ও ভুয়া চালান নির্মূল হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক :জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, রাজস্ব আহরণ পুরোপুরি ডিজিটাল হলে কর ফাঁকি কমবে, ভুয়া চালান নির্মূল হবে, সুশাসন জোরদার হবে এবং বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।

গতকাল রোববার এনবিআর ভবনে করপোরেট কর পরিশোধ ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও ডিজিটাল করতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে বড় অঙ্কের কর পরিশোধ কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে এনবিআর ও বিকাশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, রাজস্ব প্রশাসনকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগোতে হবে।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে দুটি সফল রিয়েল-টাইম লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রমাণ করে বড় অঙ্কের অর্থ নিরাপদ ও দক্ষতার সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে পরিশোধ করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগ আমাদের ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রমকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। আমরা চাই সব ধরনের কর পরিশোধই ডিজিটাল হোক, কারণ ডিজিটাল লেনদেনে রিয়েল-টাইম নিষ্পত্তি, নির্ভুলতা, স্বচ্ছতা এবং ঝুঁকি হ্রাসসহ একাধিক সুবিধা রয়েছে।

এনবিআর চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগত করদাতারা দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা কার্ডের মাধ্যমে ছোট অঙ্কের কর পরিশোধ করে আসছেন। কিন্তু করপোরেট করের অঙ্ক অনেক বড়-কখনো ১০০ কোটি থেকে ৪০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি। ডিজিটাল ওয়ালেট ও মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এ ধরনের অর্থ প্রদান বড় করদাতাদের জন্য সুবিধাজনক হবে এবং রাজস্ব পর্যবেক্ষণ আরও শক্তিশালী হবে।

তিনি বলেন, এই প্ল্যাটফর্মটি নগদ, রকেট, সেলফিন এবং উপায়সহ সকল লাইসেন্সপ্রাপ্ত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারীর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আরও অনেক অপারেটর বড় অংকের কর লেনদেনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো আইনি বাধা নেই বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।

ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা তুলে ধরে তিনি বলেন, নগদ অর্থের ব্যবহার থেকে সরে এলে বড় অঙ্কের টাকা বহনের সঙ্গে জড়িত চুরি, জালিয়াতি ও সহিংস অপরাধের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। যদি অর্থ বহন করার প্রয়োজনই না থাকে, তাহলে এসব ঝুঁকিও আর থাকবে না।

আবদুর রহমান খান আরও বলেন, নগদ অর্থ ব্যবহারের একটা বড় অর্থনৈতিক খরচ রয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিবছর টাকা ছাপাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই বহন করতে হয়। ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে নগদ লেনদেন কমানো গেলে এই ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান ম্যানুয়াল চালান ও কাগজভিত্তিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে বাতিল করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, ২০১৮ সালে সাত অঙ্কের অর্থনৈতিক কোড চালু করা হলেও এখনো কিছু রাজস্ব পুরোনো চার অঙ্কের কোড ব্যবহার করে জমা দেওয়া হচ্ছে, যা রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং ব্যাহত করছে।

তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থা চালুর আট বছর পরও পুরোনো কোড ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা নেই। ভ্যাট ব্যবসায়ীদের ওপর চাপানো কর নয়, বরং ভোক্তাদের কাছ থেকে সরকারের পক্ষে সংগ্রহ করা হয়। ডিজিটালাইজেশন এ দায়িত্বকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করবে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভ্যাট কোনো ব্যবসায়ীর ওপর আরোপিত কর নয়, এটি ভোক্তার কাছ থেকে সরকারের পক্ষে আদায় করা হয়। ব্যবসায়ীরা এখানে কর সংগ্রাহকের ভূমিকা পালন করেন, আর ডিজিটালাইজেশন এই দায়িত্বকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করবে।

কর পরিশোধে পে-অর্ডার ও ক্রসড চেক সম্পূর্ণভাবে বাতিলের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আধুনিক ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেলের যুগে এসব মাধ্যম অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা করদাতা ও রাষ্ট্র-উভয়ের জন্যই উপকারী একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি।

সম্প্রতি ‘করপোরেট ভ্যাট-ট্যাক্স পেমেন্ট সলিউশন’ নামে এই সেবা নিয়ে এসেছে মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (এমএফএস) বিকাশ।

গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিকাশ জানিয়েছে, নতুন এই সেবার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যাংক হিসাব বা ডিসবার্সমেন্ট ওয়ালেট থেকে কোনো খরচ ছাড়াই বিকাশের বিশেষ মার্চেন্ট ওয়ালেটে অর্থ স্থানান্তর করতে পারবে। অর্থাৎ বিকাশ ব্যবহার করে ই-টিডিএস থেকে এ-চালানের মাধ্যমে বড় পরিমাণ অর্থের লেনদেন করতে পারবে কোম্পানিগুলো। ফলে ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর পরিশোধের ঝামেলা এড়ানো যাবে।

বিকাশের এই প্ল্যাটফর্ম এনবিআর ই-টিডিএস ও আইবাস, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ প্রাসঙ্গিক সব সরকারি সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ লেনদেনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনবিআর সিস্টেমে যুক্ত হবে। ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজিটাল চালান তৈরি হবে এবং রিয়েল টাইমে লেনদেনের সর্বশেষ অবস্থা (স্ট্যাটাস) যাচাই করা যাবে। এতে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও তাদের ভেন্ডারদের আর কাগজপত্র, ম্যানুয়াল রিকনসিলিয়েশন বা সার্টিফিকেট আদান-প্রদানে সময় নষ্ট হবে না।

বিকাশের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মঈনুদ্দিন মোহাম্মদ রাহগীর বলেন, এই পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে ব্যাংকিং সময় বা শাখায় সশরীর যাওয়া ছাড়াই সপ্তাহের যে কোনো দিন এবং যে কোনো স্থান থেকে কর, শুল্ক ও অন্যান্য সরকারি মাশুল পরিশোধ করা যাবে। এতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মক্ষেত্র থেকেই পুরোপুরি ডিজিটালভাবে কর দিতে পারবে।