নিলুফা আক্তার : দেশজুড়ে চলমান সিলিন্ডার গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানির সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে একটি গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নগর সংকটে রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, বাসস্থান, পারিবারিক স্থিতিশীলতা এবং সামগ্রিক নগর কাঠামোর ওপর। কয়েক মাস আগেও যেখানে একটি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ছিল এক হাজার ৫০০ টাকার আশপাশে, সেখানে বর্তমানে সেই একই সিলিন্ডার কিনতে গুনতে হচ্ছে সর্বোচ্চ চার হাজার টাকা পর্যন্ত। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কোনো স্বাভাবিক বাজারগত পরিবর্তন নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের শহরভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থায় সিলিন্ডার গ্যাস একটি অনিবার্য বাস্তবতা। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা এবং বড় শহরগুলোর নতুন গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়েই এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে একটি অনিয়ন্ত্রিত বাজার, যেখানে ভোক্তাদের কোনো বিকল্প নেই এবং ব্যবসায়ীরা কার্যত একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করছে। বর্তমান সংকট সেই বাস্তবতাকেই আরও নির্মমভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয়ের হিসাব করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গড়ে দুই থেকে তিনটি সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হয় একটি পরিবারকে। বর্তমান বাজারদরে যার খরচ দাঁড়াচ্ছে আট হাজার থেকে বারো হাজার টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে যোগ হয় বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, বাজার খরচ, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষা ব্যয়। সব মিলিয়ে সংসার চালানো অনেক পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ বাধ্য হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা তারা কখনোই স্বেচ্ছায় নিতে চাইত না—বাসা ছেড়ে দেওয়া।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে, সিলিন্ডার গ্যাসনির্ভর বাসাগুলোতে একের পর এক ভাড়াটিয়া চলে যাচ্ছে। কেউ লাইনের গ্যাস আছে এমন এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করছে, কেউ শহরের প্রান্তিক এলাকায় কম খরচের বাসা খুঁজছে, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের বাসায় অস্থায়ী আশ্রয় নিচ্ছে। এই প্রবণতা শহরের ভাড়া বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। যেসব এলাকায় লাইনের গ্যাস নেই, সেখানে ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে থাকছে, বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না। অন্যদিকে যেসব এলাকায় গ্যাস সংযোগ আছে, সেখানে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে। ফলে শহরের ভেতরেই এক ধরনের বৈষম্য ও অসম ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে।
এই সংকটের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক ও মানসিক ক্ষেত্রেও গভীর ক্ষত তৈরি করছে। রান্না নিয়ে দুশ্চিন্তা এখন অনেক পরিবারের নিত্যদিনের বাস্তবতা। কখন সিলিন্ডার শেষ হবে, নতুন সিলিন্ডার পাওয়া যাবে কি না, দাম আরও বাড়বে কি না—এই অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। অনেক পরিবার খাবারের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য কমাচ্ছে, কেউ এক বেলা রান্নার দিকে ঝুঁকছে, কেউ বাইরে থেকে খাবার আনার চেষ্টা করছে। এসব আপাত সমাধান দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পারিবারিক অশান্তি বাড়াচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারি পর্যায়ে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে সেই দাম কার্যকর হচ্ছে না। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন প্রতি মাসে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই। যখন সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার ৩০৬ টাকা, তখন চার হাজার টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি হওয়া মানে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা। প্রশ্ন উঠছে—এই বাজার কে নিয়ন্ত্রণ করছে? রাষ্ট্র, না ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট?
ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, পরিবহন ব্যয়, আমদানি খরচ এবং সরবরাহ সংকটের কারণে দাম বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারিভাবে দাম যেখানে মাত্র ৩০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, সেখানে বাজারে দাম বেড়েছে প্রায় শতভাগ। এই ব্যবধান কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। এটি স্পষ্টভাবে সুযোগসন্ধানী মুনাফার ইঙ্গিত দেয়। দুর্বল তদারকি ও নজরদারির সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করে মুনাফা করছে।
এই সংকট আমাদের আরেকটি বড় বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—জ্বালানি সংকট মানে শুধু রান্নার সমস্যা নয়, এটি মানুষের বসবাসের অধিকার, নগর পরিকল্পনা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। মানুষ যখন শুধু গ্যাসের খরচের কারণে বাসা ছাড়তে বাধ্য হয়, তখন সেটি এক ধরনের নগর বাস্তুচ্যুতি। এই বাস্তুচ্যুতি নীরব, কিন্তু তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, শিশুদের স্কুল বদলাতে হচ্ছে, কর্মজীবী মানুষকে নতুন এলাকায় নতুন করে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে, পাড়া-প্রতিবেশীর বন্ধন দুর্বল হচ্ছে। শহরের যে সামাজিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। এই পরিবর্তন হয়তো চোখে পড়ছে না তাৎক্ষণিকভাবে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এই সংকটের কোনো স্পষ্ট ও কার্যকর সমাধানের রূপরেখা এখনও দেখা যাচ্ছে না। পাইপলাইন গ্যাস সম্প্রসারণ কার্যত স্থবির। এলপি গ্যাস বাজারে নজরদারি দুর্বল। ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্ব কাজ করছে।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক সংকট, যার সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। এলপি গ্যাস বাজারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও মজুত ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, পাইপলাইন গ্যাস সম্প্রসারণে বাস্তব উদ্যোগ এবং ভোক্তা অধিকার রক্ষায় কার্যকর তদারকি—এসব ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
সিলিন্ডার গ্যাসের আগুনে আজ শুধু চুলা জ্বলছে না; পুড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন, পুড়ছে তাদের স্বপ্ন ও স্থিতিশীলতা। এই আগুন নেভাতে না পারলে এর আঁচ আরও দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে—রান্নাঘর পেরিয়ে পুরো শহরজুড়ে।
প্রিন্ট করুন




Discussion about this post