রমজান মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে সব সময়ই আলোচনার ঝড় ওঠে। চলতি রমজানেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। প্রথম দিকে সবজির বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের বেশ ভোগান্তির মুখে পড়তে হলেও বর্তমানে সেই পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে সবজির দাম এখন তুলনামূলক কমে এসেছে, ফলে ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
তবে সবজির বাজারে স্বস্তি ফিরলেও নতুন করে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মুরগির বাজার। বিশেষ করে ব্রয়লার মুরগির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা বেশ বিপাকে পড়েছেন। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে, যা রমজানের বাজারে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানের শুরুতে যেসব সবজি ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছিল, বর্তমানে সেগুলোর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বাজারে সরবরাহ বাড়ার কারণে বেশিরভাগ সবজির দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে।
বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন সবজির দাম নিম্নরূপ—
-
বেগুন: কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা
-
করলা: ৬০ থেকে ৭০ টাকা
-
ঢেঁড়স: ৫০ থেকে ৬০ টাকা
-
পটল: ৫০ থেকে ৬০ টাকা
-
চিচিঙ্গা: ৫০ থেকে ৬০ টাকা
এছাড়াও অন্যান্য জনপ্রিয় সবজির দামও তুলনামূলক কমে এসেছে। শসা এখন কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ক্ষিরা ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং কাঁচা পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। কাঁকরোলের দামও এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানের প্রথম দিকে সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় দাম বাড়তি ছিল। তবে এখন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যাপ্ত সবজি বাজারে আসতে শুরু করায় দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এসেছে।
রমজান মাসে ইফতারের টেবিলে লেবুর চাহিদা সব সময়ই বেশি থাকে। তাই রোজার শুরুতে লেবুর দামও আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছিল। রোজার আগের দিন যেখানে প্রতি হালি লেবু ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, বর্তমানে সেই দাম কমে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় নেমে এসেছে।
অন্যদিকে বড় আকারের লেবু এখন ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা রমজানের আগে ১৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। ফলে লেবুর বাজারেও এখন কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।
শসা এবং বেগুন—এই দুই সবজি রমজানে ইফতারি তৈরিতে বেশি ব্যবহৃত হয়। রমজানের শুরুতে এই দুই সবজির দামও বেশ বেশি ছিল। তবে বর্তমানে এই দুই পণ্যের দাম কেজিপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ৩০ টাকা কমেছে।
বর্তমানে শসা কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে বেগুনের দামও কিছুটা কমে এখন ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে বাজারে ক্রেতার সংখ্যা কিছুটা কম। ফলে দাম আপাতত স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
সবজির বাজারে অন্যান্য পণ্যের দামও তুলনামূলক সহনীয় অবস্থায় রয়েছে।
-
লাউ: প্রতিটি ৪০ থেকে ৭০ টাকা
-
চালকুমড়া: আকারভেদে ৬০ থেকে ৯০ টাকা
-
মিষ্টি কুমড়া: কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা
-
কচু: ৪০ থেকে ৫০ টাকা
এছাড়াও বাজারে টমেটো কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং আলু মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলুর দাম কম থাকায় অনেক পরিবারই এখন রান্নায় আলুর ব্যবহার বাড়িয়েছেন।
সবজির বাজারে স্বস্তি থাকলেও মুরগির বাজারে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
গত সপ্তাহে যেখানে ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, বর্তমানে সেই দাম বেড়ে ২৩০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
এমন হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রয়লার মুরগির পাশাপাশি অন্যান্য জাতের মুরগির দামও বেশ বেশি। বাজারে বর্তমানে—
-
কক মুরগি: কেজিপ্রতি প্রায় ৩৫০ টাকা
-
লেয়ার মুরগি: প্রায় ৩৬০ টাকা
-
দেশি মুরগি: কেজিপ্রতি প্রায় ৭৩০ টাকা
এই দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অনেক ক্রেতাই অভিযোগ করছেন।
মুরগির দামের এমন হঠাৎ বৃদ্ধিতে বাজারে আসা ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা গেছে। অনেকেই বলছেন, অল্প সময়ে এত বড় দাম বৃদ্ধি তাদের সংসারের বাজেটকে এলোমেলো করে দিচ্ছে।
রাজধানীর একটি বাজারে মুরগি কিনতে আসা একজন ক্রেতা বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে মুরগির দাম এতটা বাড়বে তিনি কল্পনাও করেননি। আগে যে মুরগি ১৮০ টাকায় কিনেছেন, এখন সেটিই ২৩০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এতে মাসিক খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
রাজধানীর মাছের বাজারেও বিভিন্ন প্রজাতির মাছের দামে বেশ পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। বাজারভেদে চাষের পাঙাশ মাছ কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়ার দাম ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং রুই মাছ ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে নদীর বড় আকারের মাছের দাম আরও বেশি। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছের দাম কেজিপ্রতি ৪০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রমজান মাসে চাহিদা বাড়ার কারণে অনেক পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। তবে সরবরাহ বাড়লে সেই দাম আবার কমে আসে। বর্তমানে সবজির বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কমেছে, কিন্তু মুরগির বাজারে সরবরাহ ও উৎপাদন খরচের প্রভাব পড়ছে।
তারা মনে করেন, বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এবং মনিটরিং জোরদার করা হলে দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post