Print Date & Time : 14 January 2026 Wednesday 3:54 am

রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর, সফলতার দেখা নেই

 মাহমুদুল হক আনসারী : কক্সবাজারের টেকনাফে বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গারা অপহরণ, মানবপাচার, মাদক কারবার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে তারা এসব অপকর্মে জড়িত হচ্ছে। বিভিন্ন নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসী বাহিনী। প্রত্যেকের হাতে রয়েছে দেশি-বিদেশি ভারী অস্ত্র। আর এসব রোহিঙ্গাদের বলি হচ্ছে সাধারণ রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা।

২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের ছোবল থেকে পালিয়ে আসে এসব রোহিঙ্গারা। আশ্রয় নেয় উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে। রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর অতিবাহিত হয়েছে, তবে রোহিঙ্গাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আতঙ্ক।

এরই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ডাকাত ‘খালেক বাহিনী’ ও ডাকাত ‘নুর কামাল বাহিনী’র মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এ ঘটনায় নুর কামাল বাহিনীর প্রধান নুর কামাল গুলিতে নিহত হয়েছে বলে গণমাধ্যমে জানা যায়। এসব ঘটনায় এলাকায় তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।

শনিবার (১০ জানুয়ারি) ভোর বেলায় টেকনাফের নয়াপাড়া রেজিস্ট্রার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাউছার সিকদার।

স্থানীয়রা জানান, ক্যাম্পে আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে। দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক গুলির শব্দে পুরো ক্যাম্প কেঁপে উঠছে। ফলে স্থানীয় জনগণ চরমভাবে নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছে। সংবাদে জানা যায়, এরা সবাই অপহরণ, ইয়াবা, মানবপাচার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে নিয়মিত। এছাড়া এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের কাছে দেশি-বিদেশি অসংখ্য ভারী অস্ত্র আছে বলে বিভিন্ন সূত্র মাধ্যম বলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ এর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন অপরাধের মূলে আড়াইশ’র অধিক মামলা হয়েছে। খুনের মামলা অন্তত ৩০টি, যার বিপরীতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অন্তত অর্ধশতাধিক। মাদক সম্পৃক্ত মামলা সবচেয়ে বেশি। যার সংখ্যা দেড় শতাধিকের বেশি। একইসঙ্গে অপহরণের ২৭টি, ধর্ষণের ১৮টি মামলা রয়েছে।

বিগত ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানে পালিয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা (যার সংখ্যা বর্তমানে ১৮ লাখের বেশি) বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর গত ৮ বছরে সাড়ে তিন শতাধিক বিভিন্ন ঘটনায় তিনশর অধিক মামলা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, আধিপত্য বিস্তার, অপহরণ ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা মিয়ানমার থেকে আনা আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করছে। তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। সাম্প্রতিক সময়ে নিয়মিতভাবে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। পুরো এলাকা এখন দুই গ্রুপের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

 

ডিআইজি মো. কাউছার সিকদার বলেন, চলতি মাসে টেকনাফের নয়াপাড়া রেজিস্ট্রার ক্যাম্প এলাকায় ডাকাত খালেক বাহিনী ও ডাকাত নুর কামাল বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে নুর কামাল বাহিনীর প্রধান নুর কামাল নিহত হয়।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দুই ডাকাতদলের মধ্যে প্রায়ই গোলাগুলি ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটে আসছে। নিহত নুর কামাল নয়াপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা ছিলেন বলে জানা যায়।

নিহত নুর কামালের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ ও মাদক সংক্রান্তসহ মোট ১১টি মামলা রয়েছে বলে সূত্র থেকে জানা যায়। র‍্যাব ও বিজিবি সূত্রে জানা যায়, অপরাধ প্রবণতা এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সবচেয়ে বেশি। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সহায়তায় দেশীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ মিলে অপহরণ, মানবপাচার ও খুনের মতো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে আসছে। বর্তমানে টেকনাফ কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির রোহিঙ্গাদের কারণে জটিল হয়ে উঠছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদেরকে যেন অন্য কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ ব্যবহার করতে না পারে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি গভীরতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের পর সমস্যাটি যে এতটা জটিল হয়ে উঠবে, তা অনেকের ভাবনায়ও ছিল না। উপরন্তু এর কিছুদিন পরই বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়, যার ফলে মনে হয়েছিল দুই দেশের সমঝোতার মাধ্যমে কোনো ধরনের সংকট ছাড়াই বাস্তুচ্যুত  রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাবে এবং সমস্যাটি দীর্ঘায়িত হবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা এই সমঝোতার কোনো বাস্তবিক প্রয়োগ দেখতে পাইনি।

এর পরিপ্রেক্ষিতে এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে পাঁচ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেখানে তিনি ধর্ম ও গোত্রনির্বিশেষে মিয়ানমারে বসবাসরত সব বেসামরিক লোকজনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের জন্য একটি ‘নিরাপদ এলাকা’ তৈরির কথা বলেন। এ ছাড়া তিনি মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত সব রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে নিরাপদে ফেরার নিশ্চয়তা প্রদানের কথা বলেন। এরই ধারাবাহিকতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে চার দফা প্রস্তাব পেশ করেন, যেখানে তিনি টেকসই প্রত্যাবাসনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন। এ ছাড়া তিনি মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করা এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের রাখাইনে সফরের আয়োজন করার কথা বলেছিলেন। পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা এবং এই সংকটের কারণ বিবেচনায় রেখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে বলেছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে এবং ২০১৯ সালের আগস্টে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ দুবারই ব্যর্থ হয়। এর ফলে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে জনমনে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের শিবিরের মধ্যে বিশাল সমাবেশ নানা রকম প্রভাব তৈরি করেছে।

এদিকে, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ অবস্থানের ফলে নানা রকম আর্থসামাজিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘায়িত হওয়ায় শিবিরে রোহিঙ্গাদের দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা ও বঞ্চনা বেড়ে চলেছে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে বৈষয়িক টানাপোড়েন ও মানসিক দূরত্ব বাড়ছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে স্থানীয় পর্যায়ে জনসংখ্যাগত যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে পারস্পরিক অসন্তোষ, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তা ছাড়া, রোহিঙ্গাদের নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। জন্মনিবন্ধন সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা, বাংলাদেশের পাসপোর্ট তৈরি করা, এমনকি ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তিকরণের তৎপরতায় তাদের লিপ্ত হওয়ার খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আসছে। তাদের কারণে বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দারা জন্মনিবন্ধন, ভোটার আইডি কার্ড পেতে হরহামেশা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষত বৃহত্তর চট্টগ্রামের নানা এলাকায় ঢুকে পড়ছে। এটা স্থায়ী বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য মারাত্মকভাবে হুমকির সৃষ্টি করেছে। এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর একটি আবদ্ল স্থানে কর্মহীন অবস্থায় বসবাস করার কারণে তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশাও লক্ষ করা যাচ্ছে। অধিকন্তু রোহিঙ্গাদের অবস্থান আরও দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের জন্য একটি নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা।

এসব কারণে রোহিঙ্গা সমস্যাটি এখন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতি সম্প্রতি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রোহিঙ্গা সংকট: চ্যালেঞ্জ এবং টেকসই সমাধান’ শিরোনামে দুই দিনব্যাপী একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রসচিবসহ দেশি-বিদেশি প্রায় ১৫০ জন গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গা সমস্যার নানা দিক নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেন এবং এই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করেন।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী সবাই এ ব্যাপারে একমত যে নিরাপদ প্রত্যাবর্তনই রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। এত বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণের ভার বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য বহন করবে, তা প্রত্যাশা করা যায় না। এ বিষয়টি সামনে রেখেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন বিষয়ে কতগুলো ব্যবস্থার কথা সম্মেলনে বারবার বলা হয়। এগুলো হলো: সাবেক প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত পাঁচ দফার আলোকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান খোঁজা; মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক মিশনগুলোর প্রচার কার্যক্রম বেগবান করা; স্থায়ী, সফল এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গাদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনায় নেওয়া; এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সংস্থা, যেমন সার্ক, আসিয়ান, বিমসটেক এবং ওআইসিকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে প্রভাবিত করা। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে জাতিসংঘের নিশ্চয়তা প্রদানকারীর ভূমিকা পালন নিশ্চিত করা। প্রত্যাবর্তন না হওয়া পর্যন্ত কিছু অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার কথাও আলোচনায় আসে, যেমন ক্যাম্পের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মানব পাচার রোধ করা, ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে তাদের উৎসাহিত করা, দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে রোহিঙ্গাদের প্রস্তুত করা, সব রোহিঙ্গার জন্য আইডি কার্ডের বিধান করা এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা। রোহিঙ্গাদের এসব সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ করার কথাও এই সম্মেলনে আলোচিত হয়, যাতে করে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো ধরনের টানাপোড়েন তৈরি না হয়।

আবার এটিও মনে রাখা প্রয়োজন যে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কেননা, একদিকে মিয়ানমার মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ঘোষণা ও সনদগুলোকে ক্রমাগত অস্বীকার করে চলেছে; অন্যদিকে প্রভাবশালী দেশ ও সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের গণহত্যা থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে স্বীকৃত আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশনের বাস্তবিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশ ও সংস্থাগুলো তাদের ভূ-কৌশলের বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এদিকে মিয়ানমারের ক্রমাগত অসহযোগিতার কারণেও বাংলাদেশের একার পক্ষে এই সংকটের সমাধান বের করা সম্ভব নয়।

তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়েই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত ব্যবস্থাগুলো নেওয়ার মাধ্যমে এই সংকটের একটি সমাধানের দিকে আমরা যেতে পারি: প্রথমত, মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে বৈশ্বিক ঐকমত্য সৃষ্টির প্রয়াস চলমান রাখা। দ্বিতীয়ত, আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য প্রভাবশালী দেশগুলো যেন মিয়ানমারকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে, সে লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের জন্য আসিয়ান এবং ওআইসির উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে ধারাবাহিকভাবে সংলাপ শুরু করার জন্য বাংলাদেশকে উদ্যোগ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে ঢাকায় কিংবা এসব দেশের রাজধানীগুলোতে ধারাবাহিক বৈঠক হতে পারে। চতুর্থত, দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় সংলাপে, আলোচনা ও মতৈক্যের বিষয়গুলোতে রোহিঙ্গাদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়াকে (যেমন তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের স্বীকৃতি, নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার, জমি ফিরে পাওয়া এবং প্রত্যাবাসনের পর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ইত্যাদি) গুরুত্ব দিতে হবে, যেন স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া কার্যকর হয়। রোহিঙ্গাদের স্বসম্মানে নাগরিক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে মিয়ানমারকে এসব নাগরিক গ্রহণ করতে বাধ্য করতে হবে।

সবশেষে এ কথা বলা যায় যে ১৯৪৮ সালে স্বাক্ষরিত সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং ২০০৫ সালের ‘রেসপনসিবিলিটি টু প্রটেক্ট’ (R2P) বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তথা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ তাদের বাধ্যবাধকতা অস্বীকার করতে পারে না। সুতরাং জাতিসংঘকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। সেই সঙ্গে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের পর অন্ততপক্ষে প্রথম তিন বছর পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে রাখতে হবে। বাংলাদেশের সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে সর্বদায় তৎপর রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ আন্তর্জাতিক মহল রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে বাস্তবিক ভূমিকা না রাখলে কখনো প্রত্যাবর্তন সমস্যা সফল হবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছে না। দেশের জনগণ দ্রুত সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা নাগরিকদের মিয়ানমারে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন চায়। তাদের যাবতীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। কোনোভাবেই রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ক্যাম্পের বাহিরে যেন না ঢুকে যেতে পারে সেই তৎপরতা নজরদারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাখতে হবে।

সংগঠক, গবেষক, কলামিস্ট