Print Date & Time : 23 April 2026 Thursday 8:21 am

ল্যাব, ফ্যাক্টরি এবং একটি যুগান্তকারী ‘করছাড়’ নীতি

শিক্ষা ডেস্ক: ফাহিম একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। তার হলের ছোট রুমের টেবিলজুড়ে ছড়ানো অসংখ্য সার্কিট, তার আর একটি অসমাপ্ত প্রজেক্ট-কৃষকদের জন্য একটি সাশ্রয়ী, সেন্সরভিত্তিক সেচ পাম্প যা মাটির আর্দ্রতা বুঝে নিজে থেকেই চালু হবে। ফাহিমের চোখে বিশাল স্বপ্ন, কিন্তু পকেটে টাকা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে যতটুকু সম্ভব কাজ সে করেছে, কিন্তু এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে মাঠে নামাতে যে ফান্ডিং দরকার, তা তার বা তার বিভাগের কাছে নেই।
অন্যদিকে, শহরতলির একটি মাঝারি আকারের কৃষি-যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানার মালিক মিস্টার রহমান। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, বিদেশ থেকে শুধু মেশিন আমদানি করে বেশিদিন ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যাবে না। নিজের কারখানায় দেশীয় পরিবেশের উপযোগী নতুন কিছু উদ্ভাবন করা ভীষণ দরকার। কিন্তু ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ বা গবেষণায় লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করার ঝুঁকি তিনি নিতে চান না। যদি প্রজেক্ট ব্যর্থ হয়? সেই আর্থিক ক্ষতি কে পোষাবে?
ফাহিম এবং মিস্টার রহমানÑদুজনেই এই দেশের মানুষ। দুজনেরই একে অপরকে ভীষণ দরকার। কিন্তু তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি অদৃশ্য, শক্ত দেয়াল। এই দেয়ালের কারণেই ফাহিমের মতো হাজারো তরুণের দুর্দান্ত সব আইডিয়া থিসিস পেপারের ফাইলে চাপা পড়ে থাকে, আর মিস্টার রহমানের মতো উদ্যোক্তারা বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে ধুঁকতে থাকেন।
কিন্তু কেমন হতো, যদি রাষ্ট্র এই দেয়ালটা ভেঙে দিত? কেমন হতো, যদি সরকার মিস্টার রহমানকে বলতো, ‘আপনি ফাহিমের গবেষণায় ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করুন, বছর শেষে আপনার কোম্পানির করপোরেট ট্যাক্স থেকে আমরা একটা বড় অংশ ছাড় দেব?’
শুধু তাই নয়, ফাহিম পাস করার পর তাকে যদি আপনার কোম্পানির ‘আরঅ্যান্ডডি’ বিভাগে চাকরি দেন, তবে সেই করছাড়ের পরিমাণ আরও বাড়বে।
এটি কোনো অলীক রূপকথা নয়। আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু করে প্রতিবেশী ভারতÑউন্নত বা উন্নয়নশীল প্রায় সব দেশ এভাবেই তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিল্পের (ইন্ডাস্ট্রি) সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন একদম উপযুক্ত সময় এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি নেওয়ার।
নীতিনির্ধারকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা: কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এই নীতি?
কাগজে-কলমে একটি নীতি পাস করা সহজ, কিন্তু সেটির সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা কঠিন। নীতিনির্ধারকদের টেবিলে বাস্তবায়নের জন্য এই নীতিমালার একটি পরিষ্কার গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো:
১. যোগ্য গবেষণার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ
করছাড়ের কথা শুনলে অনেকেই এর অপব্যবহার বা ফাঁকফোকর খোঁজার চেষ্টা করতে পারেন। তাই শুরুতেই আইনের ভাষায় নির্দিষ্ট করে দিতে হবে ঠিক কোন ধরনের গবেষণায় টাকা দিলে করছাড় মিলবে।
করণীয়: শুধু রুটিন কাজ, সাধারণ মানোন্নয়ন বা বিদেশি পণ্যের হুবহু নকল করার জন্য এই ছাড় দেওয়া যাবে না। গবেষণাটি হতে হবে মৌলিক বা ফলিত। যেমনÑনতুন কোনো সফটওয়্যার তৈরি, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং আবিষ্কার, কৃষির নতুন যন্ত্র উদ্ভাবন বা স্বাস্থ্য খাতের কোনো প্রযুক্তি। সরকার একটি ‘জাতীয় অগ্রাধিকার তালিকা’ প্রকাশ করতে পারে, যেসব খাতে বিনিয়োগ করলে সর্বোচ্চ করছাড় পাওয়া যাবে।
২. স্তরভিত্তিক করছাড় চালু করা
সব বিনিয়োগের ধরন ও ঝুঁকি সমান নয়, তাই করছাড়ের পরিমাণও এক রকম হওয়া উচিত নয়। একে কয়েকটি স্তরে ভাগ করতে হবে।
করণীয়:
স্তর ১ (গবেষণায় ফান্ডিং): কোনো কোম্পানি যদি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নির্দিষ্ট গবেষণায় ফান্ড দেয়, তবে সেই বিনিয়োগ করা টাকার ওপর ১৫০% থেকে ২০০% ‘ওয়েটেড ট্যাক্স ডিডাকশন’ বা কর রেয়াত দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ ১০০ টাকা খরচ করলে কোম্পানি তার মোট আয় থেকে ২০০ টাকা খরচ হিসেবে দেখিয়ে করের বোঝা কমাতে পারবে।
স্তর ২ (নতুনদের নিয়োগ): যেসব কোম্পানি সদ্য পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের সরাসরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (জ্উ) পদে চাকরি দেবে, তাদের প্রথম দুই বছরের বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশের সমপরিমাণ টাকা কোম্পানির প্রদেয় কর থেকে সরাসরি কমানোর সুযোগ দিতে হবে।
৩. মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় স্পষ্ট আইন:
কোম্পানি টাকা দিলে শেষ পর্যন্ত উদ্ভাবনের মালিকানা কার হবেÑবিশ্ববিদ্যালয়ের, নাকি কোম্পানির? এটি নিয়ে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।
করণীয়: একটি আদর্শ ‘একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপ নীতিমালা’ তৈরি করতে হবে। যেখানে স্পষ্ট বলা থাকবে, উদ্ভাবনের প্যাটেন্ট বা স্বত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের ও গবেষকের নামেই থাকবে। তবে যে কোম্পানি ফান্ড দেবে, তারা আগামী ৫ বা ১০ বছরের জন্য বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে সেই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের এক্সক্লুসিভ অধিকার পাবে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ও গবেষকের অধিকার বাঁচবে, আবার কোম্পানির ব্যবসাও সফল হবে।
৪. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
‘গবেষণার নামে পরিচিত কোনো অধ্যাপককে কিছু টাকা দিয়ে ভুয়া রিপোর্ট বানিয়ে করছাড় নিয়ে নিল না তো?’Ñএই ভয়টা আমাদের প্রেক্ষাপটে অমূলক নয়।
করণীয়: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন ‘জ্উ মূল্যায়ন ও মনিটরিং সেল’ গঠন করতে হবে। কোম্পানি করছাড় দাবি করার আগে এই কমিটিকে প্রমাণ করতে হবে যে, টাকাটা আসলেই ল্যাবের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল বা গবেষকদের ভাতায় খরচ হয়েছে। ডিজিটাল মানি ট্র্যাকিং এবং থার্ড-পার্টি অডিট এখানে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৫. এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্যাকেজ
বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান সহজেই কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু দেশের অর্থনীতির প্রাণ মাঝারি বা ছোট কোম্পানিগুলো এই সুযোগ থেকে যেন বঞ্চিত না হয়।
করণীয়: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য করছাড়ের শর্তগুলো আরও সহজ ও নমনীয় করতে হবে। তারা চাইলে কয়েকটি ছোট কোম্পানি মিলে একটি ‘কনসোর্টিয়াম’ বা জোট গঠন করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় প্রজেক্টে যৌথ ফান্ডিং করতে পারবে এবং সবাই তাদের বিনিয়োগের অনুপাতে বছর শেষে করছাড়ের সুবিধা পাবে।
শেষ কথা: মাননীয় নীতিনির্ধারকরা করছাড় দেওয়া মানেই সরকারের রাজস্ব বা আয় কমে যাওয়া নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। আজকে আপনি ফাহিমের প্রজেক্টে যে ১০ টাকা করছাড় দেবেন, কাল সেই উদ্ভাবন থেকে তৈরি হওয়া নতুন শিল্প কারখানা সরকারকে ১০০ টাকা ট্যাক্স ফিরিয়ে দেবে। সেই কারখানায় তৈরি হবে হাজারো নতুন কর্মসংস্থান। কমবে আমদানিনির্ভরতা, বাঁচবে মহামূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।
আজকে যদি আমরা এই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করি, তবে ফাহিমের মতো তরুণরা হয়তো হতাশ হয়ে স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাবে। আর মিস্টার রহমানের কারখানায় বিদেশি মেশিনের জং ধরা নাট-বোল্টই ঘুরতে থাকবে অনন্তকাল।
আসুন, ফাহিমের ল্যাব আর মিস্টার রহমানের কারখানার মধ্যের এই অদৃশ্য দেয়ালটা আমরা ভেঙে দিই। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য সরিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশের ভিত গড়ি, যার ভিত্তি হবে ‘আমাদের নিজস্ব উদ্ভাবন’। এখনই সময়।