Print Date & Time : 25 April 2026 Saturday 3:23 am

শতবর্ষী ঐতিহ্যের আসরে কোটি টাকার বাণিজ্য

চট্টগ্রাম ব্যুরো: কুস্তির আসর ছাপিয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি এখন দক্ষিণ বাংলার অন্যতম বৃহৎ উৎসব-অর্থনীতির কেন্দ্রÑ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে করপোরেট স্পনসর, রিকশাচালক থেকে কারিগরÑ সবার নজর এই দুই দিনে। ১৯০৯ সালে যখন আবদুল জব্বার সওদাগর লালদীঘির মাঠে তরুণদের শরীর ও মনোবল শক্ত করতে বলীখেলার সূচনা করেছিলেন, তখন নিশ্চয়ই তিনি ভাবেননি যে একদিন এই কুস্তির আসর ঘিরে কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য আবর্তিত হবে। এবার সেই আয়োজনের ১১৭তম আসর। আজ শনিবার চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী আবদুল জব্বারের বলীখেলার ১১৭তম আসর। আর সেই খেলাকে কেন্দ্র করে যে বৈশাখী মেলা বসছে, সেটি এখন আর শুধু লোকজ উৎসব নয়Ñ এটি চট্টগ্রামের স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি বার্ষিক চালিকাশক্তি।
মেলাকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় তার পরিমাণ ছোট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে কয়েকশ অস্থায়ী দোকান বসে। প্রতিটি দোকানে গড়ে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার বিক্রি হলে মোট লেনদেন সহজেই ৫ থেকে ১০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় খাবার, খেলনা, হস্তশিল্প ও পোশাক খাতে।
আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক শওকত আনোয়ার বাদল ও সভাপতি মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, বলীখেলার ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে তারা কাজ করছেন। একইসঙ্গে মরহুম আবদুল জব্বার সওদাগরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান ও চট্টগ্রামে একটি বলি খেলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তারা।
বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদীঘি ময়দানের আশপাশে প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। এটি বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকার সবচেয়ে বৃহৎ বৈশাখী মেলা। মেলা শুরুর কয়েক দিন আগে থেকেই আন্দরকিল্লা, বদরপাতি, কোতোয়ালি ও সিনেমা প্যালেস এলাকার সড়ক ও ফুটপাতে দোকান বসতে শুরু করে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা কাঠ, বাঁশ, বেত, মাটির জিনিস, পাটজাত পণ্য, দেশীয় পোশাক, কসমেটিকস, শিশুদের খেলনা, মিষ্টি, শরবত ও ঘর সাজানোর সামগ্রীসহ নানা পণ্য বিক্রি করেন। প্রতিবছর খেলাকে ঘিরে তিন দিনের মেলা হলেও এবার মেলা হবে দুই দিন।
২৬ এপ্রিল এসএসসি পরীক্ষা থাকায় এদিন ভোরেই মেলা শেষ করতে বলা হয়েছে। তদুপরি প্রধান সড়কে দোকান না বসানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। এই বিধিনিষেধ মেলার শেষ দিনের বাণিজ্যে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন একাংশ ব্যবসায়ী। তবে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশাবাদের কারণও আছে। মূল্যস্ফীতির মধ্যেও সাংস্কৃতিক উৎসবে মানুষের অংশগ্রহণ সাধারণত কমে নাÑ বরং এটি সাশ্রয়ী বিনোদন হিসেবে পরিবারগুলোর কাছে জনপ্রিয় থাকে। আশপাশের উপজেলা ও জেলা থেকে আসা লাখো দর্শনার্থীর উপস্থিতি মূল দিনের বিক্রিকে বরাবরের মতোই সচল রাখবে বলে মনে করছেন আয়োজকরা।
এই মেলাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তারা। গ্রামাঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীরা হাতে তৈরি পণ্য, মাটির জিনিস, বাঁশ-বেতের সামগ্রী ও লোকজ পণ্য বিক্রি করেন। অনেকের জন্য এই দুই দিনের বিক্রিই বছরের একটি উল্লেখযোগ্য আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তারা প্রতিবারের মতো এবারও অংশ নিচ্ছেন। মেলার অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু দোকানদারিতে সীমাবদ্ধ নয়। রিকশা, অটোরিকশা ও ভাড়াভিত্তিক যানবাহনের চালকদের আয় মেলার দিনগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যায় বলে জানা যায়। পাশাপাশি আশপাশের রেস্তোরাঁ, হোটেল ও ক্ষুদ্র সেবাদাতারাও অতিরিক্ত ক্রেতা পান। স্টল সাজানো থেকে শুরু করে মালামাল বহন, নিরাপত্তারক্ষী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও পরিবহনকর্মী মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষের হাতে এই সময়ে বাড়তি উপার্জন আসে।
তবে এই বাণিজ্যের অন্যদিকও আছে। অনেক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, মেলা শুরুর আগে জায়গা পাওয়া, দোকান বসানো, পরিবহন, শ্রমিক, নিরাপত্তা, এমনকি নানা অনানুষ্ঠানিক খরচ তাদের ওপর চাপ তৈরি করে। ফলে মোট বিক্রি ভালো হলেও লাভের অংশ অনেক সময় প্রত্যাশার চেয়ে কম থাকে। আবার চাঁদা, ভাড়া ও অন্যান্য খরচ যোগ হলে ছোট ব্যবসায়ীদের মার্জিন আরও সংকুচিত হয়। এ কারণে মেলা ঘিরে অর্থনৈতিক প্রবাহ যতই বড় হোক, এর লাভ সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয় না। এবারের মেলায় আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে। অনেক সময় ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা থাকলেও এর অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে স্বচ্ছতা দেখা যায় না। আয়োজক কমিটি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি স্টলসংখ্যা, ভাড়া, দর্শনার্থীর চাপ, এবং মোট বিক্রির একটি আনুমানিক হিসাব প্রকাশ করত, তাহলে এই আয়োজনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যেত।
জব্বারের বলীখেলা শতবর্ষ পেরিয়ে এখন যে অবস্থানে এসেছে, সেখানে এর সাংস্কৃতিক মর্যাদা যেমন বড়, তেমনি ব্যবসায়িক প্রভাবও অস্বীকার করার মতো নয়। একদিকে এটি চট্টগ্রামের লোকজ ঐতিহ্যের প্রতীক, অন্যদিকে এটি স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি মৌসুমি নগদ প্রবাহ। চট্টগ্রামের মানুষ যখন বলীখেলা দেখতে ভিড় করেন, তখন শুধু কুস্তির লড়াই হয় না; পাশাপাশি চলে কেনাবেচার লড়াইও। আর সেই বাণিজ্যের ভেতরেই জব্বারের বলীখেলা আজও টিকে আছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উৎসব হিসেবে।