মো. সাইদুর রহমান : শিক্ষকতা এক পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। মা-বাবা এবং বড়দের কাছ থেকে শুনেছি শিক্ষকতা মানেই সম্মান, মর্জাদা, আদর্শ, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী, জাতির বিবেক, দেশ ও সমাজের সম্পত্তি। আমরা শিখেছিও এটা। এখনও মনে করি, শিক্ষকরা এমনই। কিন্তু বর্তমানের সঙ্গে মিল খুঁজতে গেলে আমরা অনেক কিছুই খুঁজে পাই না। শুনে আসা শিক্ষকদের গল্পের সঙ্গে বাস্তবতার যেন এক সমুদ্র পরিমাণ পার্থক্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ এবং মাদরাসাসহ সব জায়গাতেই শিক্ষক মানে ছিলেন জ্ঞান বিতরণের পথপ্রদর্শক, গবেষণার অগ্রদূত এবং নৈতিকতার আদর্শ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই চিত্র বদলে গেছে। এখন অনেক শিক্ষকই পরিচিত হচ্ছেন রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে। কেউ বিএনপি, কেউ আওয়ামী লীগ, কেউ জামায়াত, কেউবা অন্য কোনো দলের সমর্থক হিসেবে। এ পরিচয় যেন শিক্ষক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
মানুষ হিসেবে একজন শিক্ষকেরও মতাদর্শ থাকতে পারে কিন্তু সমস্যা তখনই ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন শিক্ষকতার মূল লক্ষ্যগুলো যেমন—জ্ঞান বিতরণ, গবেষণা করা এবং ছাত্রদের নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সবকিছুর পেছনে চলে যায়। অনেকে এখন নিজের যোগ্যতা বা দক্ষতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্যের জোরে পদোন্নতি, সিন্ডিকেটের আসন বা প্রশাসনিক দায়িত্ব পেতে চান। এ লড়াইয়ে শোনা যায় অপমানজনক ভাষা ‘তুই জামায়াত, তুই বিএনপি, তুই আওয়ামী লীগের দোসর, তুই দালালসহ বহু কথা, যা আমরা প্রায়ই পত্রিকা কিংবা বিভিন্ন ছোট ভিডিও ক্লিপে দেখি, এসব তো সামান্যই। আমাদের চোখের আড়ালে আরও কত কী হতে পারে, তার একটা ধারণা আহমদ ছফার কালজয়ী উপন্যাস ‘গাভী বৃত্তান্ত’ পড়লে আন্দাজ করা যায়। এসব দেখলে মনে হয় এটি কোনো শিক্ষাঙ্গন নয়, বরং রাজনৈতিক মহা সমাবেশের মঞ্চ। শিক্ষক রাজনীতির পেছনে শত শত যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু এর ফলাফল সত্যি উদ্বেগজনক। শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে শিক্ষকদের প্রতিপক্ষ হয়ে যায়। শিক্ষকরা তখন তাদের শিক্ষার্থী মনে করেন না, মনে করেন তাদের একজন প্রতিপক্ষ। তখন শিক্ষকরা আর আদর্শের প্রতীক নন, বরং হয়ে ওঠেন নৈতিক অধঃপতন, বৈষম্য ও বিভাজনের প্রতিচ্ছবি। বিশ্ববিদ্যালয় মানে যেখানে হওয়ার কথা মুক্তচিন্তা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার লড়াই, দলাদলি, কোন্দল আর দলীয় স্বার্থ। নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক কাজে দলীয় পরিচয়ের প্রভাব এখন গোপন নয় বরং প্রকাশ্য। সরকার পরিবর্তনের পর কেউ পদত্যাগ করে, কেউ পালিয়ে যায়, কেউ বহিষ্কার বা বরখাস্ত হয়, কেউ পদবঞ্চিত হয়, কেউ আবার নতুন ক্ষমতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। এসব দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, তবে কী শিক্ষকতাও সরকারের মত? ভোটে হেরেছি তো গদি শেষ!
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিছু শিক্ষকের দুর্নীতির যে আমলনামা উন্মোচিত হয়েছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে উন্নয়নমূলক কাজ, সবখানেই তাদের দুর্নীতির ছাপ দেখতে পেয়েছি। এতদিন দলীয় ক্ষমতার দাপটে এসব অপকর্ম আড়ালে থাকলেও, পটপরিবর্তনের পর আজ তা প্রকাশ্য। পত্রিকার পাতায় পাতায় এখন শিক্ষকদের দুর্নীতির খবর, যা দেশ ও সমাজের জন্য চরম লজ্জার। ভাবা যায়? যিনি আমার আদর্শ, তিনি আজ আসামি! এ যেন আমাদের সাত পুরুষের দুর্ভাগ্য। মনে আজ কঠিন এক প্রশ্ন জাগে, শিক্ষকরাই যদি দুর্নীতির স্রোতে গা ভাসান, তবে দুর্নীতিমুক্ত ছাত্র গড়বে কে? তাদের এই কর্মকাণ্ড দেশ ও জাতিকে কী বার্তা দিচ্ছে? এই সমাজ কীভাবে বদলাবে? এই অবক্ষয়ের ক্ষত কতটা গভীর, তা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এত অবক্ষয়ের ভিড়েও আমাদের সৌভাগ্য যে, এখনও কিছু সৎ শিক্ষক সমাজে বিদ্যমান। মূলত তাদের হাত ধরেই আমাদের ধ্বংসপ্রায় শিক্ষাব্যবস্থা কোনোমতে টিকে আছে।
একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠনগুলো শিক্ষকদের অধিকার, ছাত্রদের অধিকার, শিক্ষার পরিবেশ ও মানোন্নয়ন নিয়ে কাজ করত। এখন তা দেখলে মনে হয় এগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন, যা ব্যবহার হয় দলীয় স্বার্থে। ফলে অনেকে পাঠদান ও গবেষণায় মনোযোগ না দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকেন। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের শিক্ষার গুণগত মান কমে যাচ্ছে, মনোজগতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও দলাদলি তৈরি হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য। যার ফলাফলে তৈরি হতে পারে একটি পঙ্গু জাতি। যদি শিক্ষকরা প্রথমে নিজেদের শিক্ষক হিসেবে পরিচয় না দেন। তারা যদি তাদের পরিচয়, তাদের শক্তিমত্তা হারিয়ে ফেলেন, তবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন কেবল স্লোগান হয়ে থাকবে। সময় এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনীতি থেকে শিক্ষকের স্বকীয়তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার। কারণ, শিক্ষক পরিচয় হারিয়ে গেলে আমরা হয়তো রাজনৈতিক কর্মী পাব, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষক আর পাব না।
শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
