আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী : রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত। এই শহর আজ এক নতুন সংকটের মুখোমুখি। স্কুল-কলেজের নিয়মিত পাঠ্যক্রমের বাইরে গড়ে ওঠা কোচিং সেন্টারগুলো এখন আর শুধু সহায়ক ভূমিকায় নেই। বরং এগুলো ধীরে ধীরে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সরকারি তথ্য ও শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই অতিরিক্ত নির্ভরতা শুধু শিক্ষার কাঠামোকেই বদলে দিচ্ছে না, এটি অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষার গুণগত মানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
রাজশাহী শহরের রাস্তায় রাস্তায়, অলিতে-গলিতে কোচিং সেন্টারের সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার আগে এসব কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের ভিড় দেখে মনে হয়, যেন স্কুল-কলেজের চেয়ে কোচিংই এখন মূল শিক্ষাকেন্দ্র। অভিভাবকরা বলছেন, ‘স্কুলে পড়ানো হয় না, কোচিং না করলে ভালো ফল আশা করা যায় না।’ কিন্তু এই ‘সমাধান’ই কি আসলে নতুন সমস্যার জš§ দিচ্ছে?
বিবিএসের তথ্য: শিক্ষায় পারিবারিক ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় সমীক্ষা (এইসআইইএস) ২০২২ অনুসারে, পরিবারের মোট ব্যয়ের মধ্যে শিক্ষা খাতে ব্যয়ের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১০ সালের দিকে এই অংশ ছিল গড়ে ৫-৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১-১৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এই হার আরও বেশি, প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ এক দশকেরও কম সময়ে শিক্ষায় পারিবারিক ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অতিরিক্ত ব্যয়ের এক বড় অংশ চলে যাচ্ছে প্রাইভেট টিউশন ও কোচিং সেন্টারে। এটি আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে একটি বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি তৈরি করেছে। এইচআইইএস তথ্যে দেখা যায়, শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে শিক্ষাব্যয়ের চাপ সবচেয়ে বেশি। খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যের পরেই শিক্ষা এখন অন্যতম বড় ব্যয়ের খাত হয়ে উঠেছে।
রাজশাহীতে একজন অভিভাবকের বাস্তব অভিজ্ঞতা: ‘দুই সন্তান এসএসসিতে। প্রত্যেকের কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, নোট-গাইড মিলিয়ে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। স্বামীর চাকরির আয়ে এই চাপ সামলানো কঠিন। কিন্তু না করলে ফল খারাপ হবে, এই ভয়ে বাধ্য হয়ে করছি।’
কোচিং অর্থনীতি হলোÑঅদৃশ্য সেক্টর যার হাতছানি হাজার কোটি টাকার বাজারমূল্যে! শিক্ষা বিশ্লেষকদের অনুমান, বাংলাদেশে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন খাত এখন একটি হাজার কোটি টাকার সমান্তরাল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। রাজশাহী শহরেই আনুমানিক ৪০০-৬০০টি কোচিং সেন্টার রয়েছে (রাজশাহী বিভাগে মোট প্রায় ৩৮৯টির মতো তথ্য পাওয়া যায়, যার বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক)।
প্রতি শিক্ষার্থীর মাসিক গড় ব্যয় ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার আগে এই ব্যয় এককালীন ১৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। শুধু রাজশাহী মহানগরীতেই বছরে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। এই খাতে শিক্ষক, কর্মচারী, প্রিন্টিং-নোট ব্যবসা, সব মিলিয়ে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে।
একটি জনপ্রিয় কোচিং সেন্টারের মালিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী সাপ্লাই দিচ্ছি। স্কুল-কলেজে যদি পুরোপুরি পড়ানো হতো, তাহলে কোচিংয়ের এত চাহিদা হতো না।’
রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সাম্প্রতিক ফলাফল বিশ্লেষণে চিত্রটি স্পষ্ট। গত কয়েক বছরে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৮ সালে যেখানে জিপিএ-৫ হার ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০২১-এ ১২ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২৪-এ তা ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ২০২৬-এর প্রজেকশনে এটি ২২-২৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
একইসঙ্গে কোচিংয়ে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। ২০১৮-এ ৫৫ শতাংশ, ২০২১-এ ৬৮ শতাংশ, ২০২৪-এ ৮০ শতাংশ, ২০২৬-এ তা ৮৫-৯০ শতাংশ হতে পারে। শহরের শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ হার গ্রামাঞ্চলের তুলনায় ২-৩ গুণ বেশি। ২০২৫ সালের এসএসসিতে রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৭.৬৩ শতাংশ (সর্বোচ্চ) এবং ২২ হাজার ৩২৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। এইচএসসিতে পাসের হার কিছুটা কমলেও (২০২৫-এ প্রায় ৫৯.৪ শতাংশ) জিপিএ-৫ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষা গবেষকরা বলছেন, এটি ‘শিক্ষার মান উন্নয়ন’ নয়, বরং পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতির ফল। কোচিংয়ে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ফল তুলনামূলক ভালো হলেও, এটি মূল জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে প্রশ্ন ধরার কৌশল ও সাজেশননির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
রাজশাহীর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বড় চাপে। একটি গড় পরিবারে ২ জন শিক্ষার্থী থাকলে তাদের কোচিং ব্যয় মাসে ১০ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। বিবিএস তথ্য অনুসারে, শহরাঞ্চলের মধ্যম আয়ের পরিবারের আয় সীমিত। এই অতিরিক্ত ব্যয় সঞ্চয় কমিয়ে দিচ্ছে, জীবনযাত্রার মানে প্রভাব ফেলছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ঋণের জালে আটকে ফেলছে।
একজন ব্যাংক কর্মকর্তা অভিভাবক বলেন, বেতন বাড়ছে না, কিন্তু শিক্ষাব্যয় আকাশছোঁয়া। সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য কোচিং করাতে গিয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়ছে।
বৈষম্য বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মাঝে, কেউ কেউ এমনটা বলছেনÑ‘কোচিং আছে তো সুযোগ আছে’! কোচিং নির্ভরতা একটি নতুন ধরনের শিক্ষাগত বৈষম্য তৈরি করছে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা কোচিং করে ভালো ফল পাচ্ছে। যাদের নেই-বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র শিক্ষার্থীরা, তারা পিছিয়ে পড়ছে। শহর-গ্রামের ফলাফলের ব্যবধান এর প্রমাণ। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করবে। গবেষকরা বলছেন, শিক্ষা যখন ‘পণ্য’ হয়ে উঠছে, তখন দরিদ্ররা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষকদের মতে, কোচিং সেন্টারগুলো মূলত শেখায়Ñপ্রশ্ন ধরার কৌশল, কম সময়ে বেশি নম্বর পাওয়ার উপায়, সাজেশননির্ভর প্রস্তুতি। ফলে শিক্ষার্থীরা বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি হারাচ্ছে, সৃজনশীলতা কমছে এবং পরীক্ষার বাইরে জ্ঞান অর্জনে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক ধারণায় দুর্বল।
এদিকে জানা যায়, অনেক শিক্ষক স্কুল-কলেজে পড়ানোর পাশাপাশি কোচিং পরিচালনা করছেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্লাসে কম পড়ানো, কোচিংয়ে বিস্তারিত পড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে আসতে উৎসাহ বা চাপ দেওয়া। এতে কনফ্লিক কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তৈরি হচ্ছে।
সরকার ২০১২ সালে নীতিমালা জারি করে শিক্ষকদের নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং নিষিদ্ধ করে। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট এটিকে বৈধ বলে রায় দেয়। কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ প্রায় নেই। অনেক শিক্ষক নিকটবর্তী ফ্ল্যাট ভাড়া করে কোচিং চালান।
সরকার বিভিন্ন সময় কোচিং নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা জারি করেছে। ২০২৬ সালের খসড়া শিক্ষা আইনে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন ও গাইডবুক ধাপে ধাপে বন্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কোচিং সেন্টারের নিবন্ধন নেই, ফি নিয়ন্ত্রণ নেই এবং প্রশাসনের তদারকি অকার্যকর। অনেক কেন্দ্র স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে বাণিজ্যিক নিবন্ধন নিয়ে চালাচ্ছে, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় আসে না।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে ‘শিক্ষা-কোচিং’ ধারণা স্থায়ী হবে। স্কুল-কলেজের গুরুত্ব কমবে, দরিদ্র শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়বে এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। শিক্ষা আর জ্ঞানার্জনের মাধ্যম থাকবে নাÑপরিণত হবে ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতায়।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ-স্কুল-কলেজে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ানো। শিক্ষকদের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মান উন্নয়ন। কোচিং সেন্টারের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনা। ফি নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রয়োগ এবং অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ রোধ। স্কুলভিত্তিক বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সহায়ক ক্লাস চালু করা। পরীক্ষা পদ্ধতিতে সংস্কারÑশুধু মুখস্থ নয়, সৃজনশীল ও বিশ্লেষণী প্রশ্ন বাড়ানো। অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাকে ‘পণ্য’ না ভাবার প্রচারণা রাজশাহী কি তার ‘শিক্ষানগরী’ পরিচয় ধরে রাখতে পারবে, নাকি কোচিং বাণিজ্যের চাপে তা হারিয়ে ফেলবে এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। বিবিএসের ব্যয়ের তথ্য এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, শিক্ষা এখন আর শুধু জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়। এটি একটি ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
সময় এসেছে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার। শিক্ষা কি পণ্য হবে, নাকি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে থাকবে? সরকার, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি স্কুল-কলেজকে শক্তিশালী করা যায়, তবেই কোচিংয়ের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমবে। অন্যথায় শিক্ষানগরীর গৌরব শুধু নামেই থেকে যাবে।
