Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 8:08 pm

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত জাতি

মো. আব্দুন নূর : শিক্ষা গোটা পৃথিবীর জন্য এক ক্রমবর্ধমান আলো। এ আলোর শক্তিতেই মানুষ অন্ধকার রাতকেও বৈদ্যুতিক বাতির মাধ্যমে আলোতে আবব্ধ করতে পেরেছে। কোটি কোটি বছরের আগের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে মানুষ কাগজের মলাটে লিপিবদ্ধ করেছে, যা আজ শিক্ষার প্রবহমান উপকরণ হিসেবেই ব্যবহূত হচ্ছে। মানুষ জলপথ, সড়ক পথের পাশাপাশি আকাশ পথেও নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে। যাতায়াতের এই সহজীকরণ শিক্ষারই দেখানো পথ। পৃথিবীতে মানুষের চলার পথকে আরও সহজ করার জন্য বিজ্ঞান যে শক্তির বলে যা কিছু উদ্ভাবন-আবিষ্কার করছে, সে শক্তি শিক্ষারই। কোনো জাতির উত্থান-পতনও নির্ভর করে এই শিক্ষার ওপর।

যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি, তখন স্কুলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা সব শিক্ষার্থীকে নিয়ে আমাদের গ্রামে একটি র‍্যালি করেছিলেন। র‍্যালিটা কীসের, তা বোঝার ক্ষমতা তখন ছিল না। সবার দেখাদেখি আমিও র‍্যালিতে অংশগ্রহণ করেছিলাম। র‍্যালিতে কেবলমাত্র একটি স্লোগান ছিল। স্লোগানটি হলো—‘শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালো।’ র‍্যালির সামনে থেকে একজন বলত—‘শিক্ষার আলো’, পেছনের আমরা সবাই সমস্বরে বলতাম—‘ঘরে ঘরে জ্বালো।’ মাঝেমধ্যে বলত—‘ঘরে ঘরে জ্বালো’, আমরা বলতাম ‘শিক্ষার আলো।’ এই স্লোগান শুনে আমার বড় খটকা লেগেছিল। শিক্ষার আবার আলো হয়, কই, আলো তো দেখতে পাই না, এইটা আবার কী আলো! সহজ কথা হলো এই স্লোগানের মর্মার্থ কিছুই বুঝিনি। নিজের মতো করে মাথায় ঘুরিয়েছি। ‘ঘরে ঘরে জ্বালো’ অংশটাতে আরও বড় খটকা লেগেছিল। আমাদের বাড়ির পাশের বাড়ির একজন চাচার নাম হলো—জালো মিয়া। ভাবলাম—জালো চাচার নামে স্লোগান দিচ্ছে কেন! আর জালো চাচা তো অন্যের ঘরে থাকেন না, নিজের ঘরেই থাকেন। স্লোগানের এই অংশটুকুরও মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝিনি। তা না বোঝারই কথা, তখন তো সবেমাত্র স্কুলে আসা-যাওয়া করি, একেবারেই ছোট। স্লোগানের কিছু বুঝি না বুঝি পরে অবশ্য কাজে লাগিয়েছিলাম। গালি হিসেবে কাজে লাগিয়েছিলাম। জালো চাচার ছেলের সঙ্গে ঝগড়া লাগলে ‘শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালো’ বলে গালি দিতাম। তার গায়ে এই গালি ভালোই আঘাত করত। একেবারে রেগেমেগে ক্ষেপে যেত। আমার দেখাদেখি অন্যরাও তার সঙ্গে ঝগড়া লাগলে এমনটা বলত। এখন ভাবছি যা গালি হিসেবে ব্যবহার করেছি, তা যদি ঘরে ঘরে বিরাজ করত—তাহলে অন্তত কখনোই এসএসসিতে ৬ লাখ তরুণ-তরুণী শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্যের খবর শুনতে হতো না। আমাদের দেশের আজকের শিক্ষাব্যবস্থার এ ক্রান্তিকালের মুখোমুখি হতে হতো না। জালো চাচা ঘরে ঘরে থাকার কথা নয়, নিজের ঘরেই থাকার কথা। এখনও নিজের ঘরেই থাকেন। কিন্তু শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বলার কথা। দীর্ঘ দেড় যুগ পরেও ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো জ্বলতে দেখিনি। আমার গ্রামের অধিকাংশ ঘর এখনও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। আমার ধারণা, আমার গ্রামের মতোই দেশের প্রতিটি গ্রামের অধিকাংশ ঘর শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত।

গ্রামে গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। ঘরে ঘরে শিক্ষার্থী আছে। কিন্তু কোথাও শিক্ষার আলো নেই। স্বয়ং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার আলো নেই। গ্রামের সপ্তম-অষ্টমের অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভালোভাবে বাংলা পড়তে জানে না, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অসহায়ত্বের কথা বাদই দিলাম—ছোট ছোট শিশুরা সারাটা বছর একগাদা বই নিয়ে আসা-যাওয়া করে কিন্তু এদের অক্ষরজ্ঞানটাও শিক্ষা দিতে পারে না বিদ্যালয়। নামমাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়তে জানেন। নবম-দশমের শিক্ষার্থী পড়তে জানলেও বইয়ের পড়া অনুধাবন করার মতো শক্তি অধিকাংশ শিক্ষার্থীর নেই। কেবল তোতাপাখির মতো মুখস্থ করতে জানে। এই দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষাব্যবস্থার। আমরাও পড়াশোনার মর্মার্থ না বুঝেই কেবল মুখস্থের জোরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এসেছি। মুখস্থের জোরেই চলছে দেশের স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের মতো উদ্ভাবন-আবিষ্কারের নেশায় পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখার সামর্থ্যও আমাদের নেই। স্বপ্ন দেখবেই বা কেমন করে, উদ্ভাবন-আবিষ্কারের নেশায় পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখার পদ্ধতিও আমাদের শিক্ষার্থীদের শেখানো হয় না। আমাদের শিক্ষার্থীদের পড়া গলাধঃকরণ করার এবং পরীক্ষার খাতায় যথাযথভাবে বমি করার পদ্ধতি শেখানো হয়।

ইউরোপের দেশগুলোয় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা স্কুলে থাকাকালীন সময়েই কেবল পড়াশোনা করেন। শিক্ষার্থীদের যা যা শেখানো প্রয়োজন, তা শিক্ষকরা ক্লাস, খেলাধুলা, আড্ডা, সংগীত, চিত্রাঙ্কন, আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে স্কুলেই শিখিয়ে দেন। বাসায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলের পড়া পড়তে হয় না। বই-পুস্তক স্কুলেই রেখে আসে। পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ না থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে বাসায় সময় কাটায়।