যুবাইর হীরা : একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর জন্য সবার আগে প্রয়োজন সুশিক্ষা এবং সুস্বাস্থ্য। তাই জাতীয় বাজেটে বা নীতিতে শিক্ষা এবং চিকিৎসাকে প্রথম দুটি অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তৃতীয় অগ্রাধিকারটি কী হওয়া উচিত ? অবকাঠামো ? তৈরি পোশাক শিল্প বা অন্যান্য প্রসেস ইন্ডাস্ট্রি ? নাকি অন্য কিছু ?
ভৌগোলিক বাস্তবতা, আগামীর বৈশ্বিক চাহিদা এবং আমাদের নিজস্ব সক্ষমতার বিচার-বিশ্লেষণ করলেই উত্তরটি খুব স্পষ্ট, বাংলাদেশের তৃতীয় জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ‘ইকো-ট্যুরিজম’। নির্দিষ্ট করে বললে ইকো-রিভার-এগ্রো-কালচারাল ও ভিলেজ ট্যুরিজম। মাত্র ৫ বছরের একটি সুচিন্তিত মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান পাল্টে দিতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির পুরো চিত্র।
প্রকৃতির অকৃপণ দান: পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম সক্রিয় বদ্বীপ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, আমাদের মোট ভূমির প্রায় ৬০ শতাংশই আবাদি জমি, যা শতাংশের হিসেবে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। নদীমাতৃক এই দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৭০০টি নদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে, যা একক দেশ হিসেবে অনন্য।
এই প্রাকৃতিক সম্পদকে আমরা এতদিন শুধু কৃষি বা মৎস্য শিকারের কাজে ব্যবহার করেছি। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতির ভাষায় এই নদী, এই সবুজ গ্রাম এবং এই উর্বর মাটি একেকটি ‘গোল্ডমাইন’ বা স্বর্ণখনি। প্রয়োজন শুধু সঠিক আহরণ ও ব্র্যান্ডিং।
একটি স্বপ্নের গ্রামের চিত্রনাট্য
কল্পনা করুন বাংলাদেশের কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রাম। পাশ দিয়ে কুলকুল শব্দে বয়ে যাচ্ছে নদী। নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে একটি নান্দনিক ‘কালচারাল ইকো ট্যুরিজম সেন্টার’। সেখানে মাটির গন্ধ মাখা মঞ্চে সন্ধ্যায় বসছে জারি-সারি বা পালাগানের আসর। পর্যটকরা মুগ্ধ হয়ে শুনছে হাজার বছরের পুরনো লোকজ সুর।
এই সেন্টারের খাবারের টেবিলে যা পরিবেশন করা হচ্ছে, তার প্রতিটি দানাহোক সেটা চাল, সবজি বা মাছ আসছে পাশের ক্ষেত বা নদী থেকে, সম্পূর্ণ অর্গানিক উপায়ে। কোনো রাসায়নিক সার বা বিষ নয়, প্রকৃতির নিয়মেই চলছে চাষাবাদ।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো এই গ্রাম বা ট্যুরিজম সেন্টারের জ্বালানি ব্যবস্থা। পুরো রিসোর্টটি এর ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্র্যান্ট), এসটিপি (সিউয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট), ফ্রিজ, টিভি থেকে শুরু করে এসি পর্যন্ত সবই চলছে সোলার পাওয়ারে। এমনকি পর্যটকদের আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহূত পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং নদীতে রিভার ক্রুজিংয়ের জন্য ব্যবহূত বোটগুলোও চলছে সোলার ব্যাটারিতে। অর্থাৎ, কার্বন ফুটপ্রিন্ট শূন্যের কোঠায়।
এটি কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়; বাংলাদেশের বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং গ্রামীণ আবহে এটি শতভাগ বাস্তবায়নযোগ্য একটি মডেল। এটিই হলো ‘ইকো-ভিলেজ ট্যুরিজম’ যেখানে পর্যটন, কৃষি এবং সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার।
কেন এটি তৃতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ?
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের জন্য সরকারের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এই অর্থ আসবে কোথা থেকে ? তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর একক নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। এখানেই ইকো-ট্যুরিজমের গুরুত্ব।
১. বিকেন্দ্রীভূত অর্থনীতি: ইকো-ট্যুরিজম শহরের টাকা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম। যখন একজন বিদেশি পর্যটক একটি গ্রামে গিয়ে অর্গানিক খাবার খান, নৌকায় ঘোরেন এবং লোকজ পণ্য কেনেন তখন সেই অর্থ সরাসরি কৃষক, মাঝি এবং গ্রামীণ নারীদের হাতে পৌঁছায়।
২. পরিবেশ রক্ষা: যদি একটি এলাকাকে ‘ইকো-ট্যুরিজম জোন’ ঘোষণা করা হয়, তখন ব্যবসায়িক স্বার্থেই সেখানকার নদী, গাছপালা এবং পরিবেশ রক্ষা করা জরুরি হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, পর্যটন এখানে পরিবেশ ধ্বংস নয়, বরং পরিবেশ সংরক্ষণের হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করবে।
৩. বিশ্ববাজারের চাহিদা: বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ‘সাসটেইনেবল ট্যুরিজম’ বা টেকসই পর্যটনের বাজার প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং এটি প্রতিবছর প্রায় ১৪ শতাংশ হারে বাড়ছে। পর্যটকরা এখন আর শুধু দালানকোঠা দেখতে চান না, তারা মাটির কাছাকাছি অভিজ্ঞতা চান। বাংলাদেশ এই চাহিদার ‘নাম্বার ওয়ান’ গন্তব্য হওয়ার ক্ষমতা রাখে।
পাঁচ বছরের মহাপরিকল্পনা ও সরকারের করণীয়
এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে হবে না। সরকারকে এটিকে ‘শিল্প’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আগামী ৫ বছরের জন্য একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বা মহাপরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।
প্রথমত, ওয়ান স্টপ সার্ভিস: এই ধরনের ইকো-ট্যুরিজম প্রজেক্ট দাঁড় করাতে হলে উদ্যোক্তাদের পরিবেশ অধিদপ্তর, বিদ্যুৎ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসনসহ প্রায় ১০-১২টি দপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হয়। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আদলে পর্যটন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি শক্তিশালী ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, গ্রিন ফাইন্যান্সিং ও কর সুবিধা: যেহেতু এই মডেলটিতে সোলার প্যানেল, ইটিপি এবং অর্গানিক ফার্মিংয়ের মতো ব্যয়বহুল পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে, তাই সরকারকে এখানে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।
ইকো-রিসোর্ট বা এগ্রো-ট্যুরিজম প্রজেক্টের জন্য ব্যবহূত সকল সোলার ইকুইপমেন্ট এবং বোটের যন্ত্রাংশ শুল্কমুক্ত (ডিউটি ফ্রি) করতে হবে।
আগামী ১০ বছরের জন্য এই খাতে পূর্ণাঙ্গ কর অবকাশ (ট্যাক্স হলিডে) এবং ভ্যাট ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে (৩-৪ শতাংশ) ‘গ্রিন লোন’ বা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক ফান্ডিং: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল (যেমন: গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড) থেকে অনুদান পাওয়ার যোগ্য। সরকার যদি এই ইকো-ট্যুরিজম মডেলকে ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট বিজনেস মডেল’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, তবে প্রচুর বিদেশি ফান্ড বা গ্রান্ট নিয়ে আসা সম্ভব, যা দিয়ে সারাদেশে এই মডেল ছড়িয়ে দেওয়া যাবে।
আমাদের আছে হাজার নদী, উর্বর মাটি আর আতিথেয়তাপূর্ণ মানুষ। আমাদের নেই শুধু সঠিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। শিক্ষা আমাদের জাতিকে আলোকিত করবে, চিকিৎসা আমাদের কর্মক্ষম রাখবে, আর ইকো-ট্যুরিজম আমাদের অর্থনীতিকে টেকসই ও সমৃদ্ধ করবে।
পোশাক শিল্পের ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগটি যেমন বিশ্বজয় করেছে, সঠিক পরিচর্যা পেলে আমাদের ‘ইকো-ট্যুরিজম’ হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় ব্র্যান্ড। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ পরিচিত হয়ে উঠুক শুধু দুর্যোগ বা ঘনবসতির দেশ হিসেবে নয়, বরং প্রকৃতির কোলে প্রশান্তির এক সবুজ আশ্রয়স্থল হিসেবে। প্রয়োজন শুধু নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা এবং একটি অগ্রাধিকারভিত্তিক মহাপরিকল্পনা।
লেখক: ইকো ট্যুরিজম উদ্যোক্তা,
ফাইন্যান্স ডিরেক্টর,
ইরাবতী ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার লিমিটেড
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post