এফ আই মাসউদ : স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জে, তখন রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কতিপয় দূরদর্শী উদ্যোক্তার বিরাট ভূমিকা ছিল। সীমিত পুঁজি, দুর্বল অবকাঠামো ও অনিশ্চিত বাজারের মধ্যেও তারা শিল্প স্থাপন করেছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন এবং ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন আজকের বাংলাদেশের করপোরেট অর্থনীতির ভিত।
এই অগ্রদূতদের একজন স্যামসন এইচ চৌধুরী। পাবনার একটি গ্রাম থেকে যাত্রা শুরু করে তিনি যে স্কয়ার গ্রুপ গড়ে তুলেছেন, তা আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী। ১৯৫৮ সালে মাত্র ৮০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠার সময় দেশে ওষুধশিল্প প্রায় অনুপস্থিত ছিল। স্থানীয় উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও মানবসম্পদ গঠনের মাধ্যমে তিনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প খাতের ভিত নির্মাণ করেন। আজ স্কয়ার গ্রুপে কর্মরত হাজারো মানুষ এবং ফার্মাসিউটিক্যালস, টেক্সটাইল, ভোগ্যপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও মিডিয়া-বহুমাত্রিক শিল্পে তাদের বিস্তার।
একইভাবে মোহাম্মদ আবুল খায়ের ছিলেন রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি ও শিল্পোদ্যোগ-সব ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমী এক চরিত্র। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর আবুল খায়ের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রগঠনের পাশাপাশি শিল্প ও অর্থনীতিতেও অবদান রাখেন। তিনি ছিলেন যমুনা ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, যা দেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। একই সঙ্গে চলচ্চিত্র প্রযোজক ও প্রদর্শক হিসেবে সংস্কৃতিশিল্পে তার ভূমিকা যেমন স্মরণীয়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধকালে চলচ্চিত্র বিভাগের নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাসে অনন্য অবস্থান তৈরি করেন। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন স্বাধীনতা পুরস্কার।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের শিল্পায়নে যাদের অবদান অনস্বীকার্য, তাদের মধ্যে আরও রয়েছেনÑলতিফুর রহমান (ট্রান্সকম গ্রুপ), সৈয়দ মঞ্জুর এ এলাহী (এপেক্স গ্রুপ), আবদুল মোনেম (আবদুল মোনেম লিমিটেড), আমজাদ খান (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ), তৌফিক এম সেরাজ (শেলটেক), জয়নুল হক শিকদার (শিকদার গ্রুপ), নূরুল ইসলাম বাবুল (যমুনা গ্রুপ), হাসেম (পার্টেক্স গ্রুপ), নূরুল কাদের (দেশ গার্মেন্টস), শেখ আকিজ উদ্দিন (আকিজ গ্রুপ), মির্জা আলী বেহরুজ ইস্পাহানি, আজিম উদ্দিন (নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা) প্রমুখ। এরা সবাই আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলেও তাদের কর্ম দিয়ে আজও অর্থনৈতিক অঙ্গনে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন।
তাদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা, কিন্তু একটি জায়গায় তারা অভিন্নÑনিজেদের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে উদ্যোগ নিলেও তাদের প্রতিষ্ঠিত শিল্প ও প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। গার্মেন্ট থেকে ব্যাংকিং, ভোগ্যপণ্য থেকে আবাসন, শিক্ষা থেকে মিডিয়া-প্রায় সব খাতেই এই উদ্যোক্তাদের হাত ধরে তৈরি হয়েছে দেশীয় করপোরেট কাঠামো।
আজ বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ, নগর কর্মসংস্থান, কর রাজস্ব এবং উদ্যোক্তা সংস্কৃতির পেছনে রয়েছে তাদের নেওয়া ঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। রাষ্ট্র যখন একা পেরে ওঠেনি, তখন বেসরকারি খাতের এই শিল্পনায়করাই এগিয়ে এসেছেন।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর দাঁড়িয়ে বলা যায়, এই উদ্যোক্তারা শুধু ব্যবসায়ী নন, তারা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থপতি। তাদের গড়া শিল্প-কারখানা, প্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থানের ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই আজকের বাংলাদেশের করপোরেট সেক্টর।
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post