শাহরিয়ার সৈকত : বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে ঝাড়া দশ মিনিট ধরে তাকিয়ে আছি কফি কাপটার দিকে। একচুল নড়ছে না ওটা! অথচ ট্রেন ছুটে চলেছে ৩৫০ কিলোমিটার গতিতে।
ঘটনা এমন- গুয়াংঝু থেকে সেনজেন এর উদ্দেশ্যে বুলেট ট্রেনে চাপার আগে এক কাপ কফি কিনে ঘড়ির দিকে তাকাতেই চোখ কপালে! আর মাত্র এক মিনিট বাকি! দোকানির দিকে তাকাতেই তিনি হাসিমুখে কিউআর কোড দেখালেন। আলি-পে দিয়ে মুহূর্তেই পেমেন্ট সেরে ফেললাম। টের পেলাম চীনের এই ক্যাশলেস ইকোনমি যে কতোটা দুর্বার।
মনে মনে বন্ধু নিলয়কে ধন্যবাদ দিলাম-ফোনে আলি-পে সেট করে দেওয়ার জন্য।
ট্রেন ছাড়ল একদম সময়মতো। বাংলাদেশের লেটলতিফের অভ্যাসটা যেন এখানে অনুপস্থিত। বসার সিট, টেবিল সবই প্রিমিয়াম কোয়ালিটির। নিজেকে ভিআইপি বলে মনে হতে লাগল। হাতের ডিসপোজেবল কাপটা টেবিলে রেখে বাইরে তাকালাল। বাতাসে শীস কেটে ট্রেন ছুটতে লাগল। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। ট্রেনের মনিটরে চোখ রাখতেই দেখি- গতি ঘণ্টায় সাড়ে তিনশ কিলোমিটার। বুলেট ট্রেন, স্পিড তো এতো হবেই, এতে আর অবাক হওয়ার কী আছে। অবাক হলাম কফির কাপটার দিকে তাকিয়ে। কাপটা যে একচুল নড়ছে না! এটাই আমাকে মুগ্ধ করল।
আমার অবাক হয়ে তাকানো খেয়াল করে মনের কথা যেন বুঝে ফেলল এক ভদ্র ও মিশুক চেহারার ২৮-৩০ বছর বয়েসি সুদর্শন চীনা যুবক-লি। স্মিত হেসে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে চাইনিজ সুরে ইংরেজিতে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, ‘এই স্থিরতা আর গতির মিশেলই তো আধুনিক চীনের অর্থনীতির মূলমন্ত্র, মাই ফ্রেন্ড’। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সাথে সখ্য হয়ে গেল।
একজন ছোট উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিল। আসলে ও একজন মাইক্রো-ম্যানুফ্যাকচারার। স্মার্টফোনে ব্যবহূত হয় এমন ছোট ছোট সেন্সর তৈরি করে সাপ্লাই করে। শহর থেকে তার ফ্যাক্টরি অনেক দূরে শুনে আমার কপালে প্রশ্নবোধক চিনহ দেখে সে নিজেই উত্তর দিল- ‘আমার ফ্যাক্টরি শহর থেকে দূরে হলেও ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই বন্দরে পৌছে যায় পণ্য, এরপর তা চলে যায় সারা দুনিয়ায়।’
মাত্র দু’ঘণ্টায় ?
হ্যাঁ, টাইম ইজ মানি-মাই ফ্রেন্ড! মুচকি হেসে লি বলল। ওর কথাটা আমার মনে গেঁথে গেল।
আমি ডুবে গেলাম গভীর ভাবনায়। আমাদের দেশেও তো কতো উদ্যমী যুবক আছে, যারা তৈরি করে স্থানীয় পণ্য, তাঁতের শাড়ি, হস্তশিল্প, কৃষি পণ্য। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার দৈন্য দশা আর অদক্ষ লজিস্টিকসের জন্য চাইলেও সময় মতো ডেলিভারি সম্পন্ন করা যায় না। জীর্ণ রাস্তাঘাট, ট্রাফিক জ্যাম, আর বন্দর অব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে সময় হয়ে ওঠে আমাদের প্রধান শত্রু। চীনের মতো এই হাইস্পিড ট্রেন আর কিউআর কোড এর ইকোসিস্টেম যদি আমরা ছোট আকারেও শুরু করতে পারতাম, তাহলে আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারা ঘরে বসেই গ্লোবাল বিজনেসের অংশীদার হতে পারত! মলিন হেসে আমি বললাম, লি, তোমার জন্য যা সময়, আমাদের জন্য তা সংগ্রাম রে ভাই!
মনে মনে উপলব্ধি করলাম, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য কেবল উৎপাদন বাড়ালেই হয় না, সেই পণ্য কত দ্রুত ক্রেতার কাছে পৌঁছাচ্ছে তা-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চীনে আমি যা দেখলাম তাকে বলা হয় ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ ইকোনমি।
কথায় কথায় লি’কে প্রশ্ন করলাম, পড়াশুনা শেষে চাকরির বদলে ব্যবসা- বাড়ি থেকে চাকরির জন্য চাপ দেয় না ? আমার কথাটা শুনে লি বেশ অবাকই হলো। বলল, ‘চীনে তো এখন উদ্যোক্তা হওয়াই স্বপ্ন, চাকরির নয়।’
আমাদের দেশের একজন তরুণ পড়ালেখা শেষে স্বপ্ন দেখে একটি ভালো চাকরির অথচ চীনে একজন উদ্যোক্তা হবার জন্য কী স্বাধীনতা। পরে বুঝলাম, ওদের দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টেছে, এ জন্য আজ এমন অবস্থায় পৌঁছতে পেরেছে ওরা। আমাদের দেশের মফস্বল এলাকায় এদের মতো যদি দৃষ্টিভঙ্গির বিপ্লব ঘটানো যেত, যদি উন্নত যোগাযোগ আর ইন্টারনেট নির্ভরযোগ্য করে তোলা যেত, কতই না ভালো হতো।
আমাদের দেশের বিভাগীয় শহরগুলোকে অন্তত যদি হাই-স্পিড কানেক্টিভিটির আওতায় আমরা আনতে পারি, তবে উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য বা কুটির শিল্প সরাসরি বিশ্ববাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
কথায় কথায় লি’কে বললাম, আমাদের দেশের তরুণরা কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং বা স্টার্ট-আপ নিয়ে কাজ করছে। তবে মনে মনে নিজেকে বললাম, দুর্ভাগ্য, আমাদের ডিজিটাল কানেক্টিভিটি থাকলেও ফিজিক্যাল কানেক্টিভিটি (রাস্তা ও পরিবহন) বেশ দুর্বল। ই-কমার্স বা লজিস্টিকস বিজনেস বড় হতে গেলে এর বিকল্প নেই।
আজকের আধুনিক চীনের মডেল থেকে আমরা শিখতে পারি-উন্নয়ন মানে কেবল বড় বড় দালান নয়, উন্নয়ন মানে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একজন সাধারণ তরুণ তার উদ্ভাবন নিয়ে সবচেয়ে কম সময়ে বাজারে পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু আফসোস! আমরা যখন যানজটে বসি ঘামছি, চীনের কোন রোবট হয়ত সে সময়ে এক সেকেন্ডে তিনটি পার্সেল তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দিচ্ছে।
আমাদের যুবকদের স্বপ্ন শুধু ‘চাকরিপ্রার্থী’ হিসেবে নয়, তাদের হতে হবে সাপ্লাই চেইন ইনোভেটর। ড্রোন ডেলিভারি, স্মার্ট ওয়্যারহাউস কিংবা কোল্ড-চেইন ট্রান্সপোর্টের মতো সেক্টরগুলোতে বাংলাদেশ এখনো নিরুত্তাপ, অথচ ব্যবসার কী বিশাল সুযোগ!
লি’র মতো হাজারো ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ নির্মাতা তাদের সাপ্লাই চেইন তৈরি করে। আমাদেরও চীনের মতো একটি শক্তিশালী জাতীয় লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।
শেনজেন এ পৌঁছে একটি ইলেক্টনিক শপ থেকে অর্ডার দিয়েছিলাম। অর্ডার করার আট মিনিটের মাথায় ড্রোন ডেলিভারি পেয়ে বুঝলাম, আসলে ব্যবধানটা যতটা না গতির তার চাইতে বেশি প্রযুক্তি ব্যবহারের সাহসের এবং দূরদৃষ্টির।
চীনে ভিক্ষুক থেকে শুরু করে রাস্তায় খেলনা বিক্রেতা সবার কাছে আছে কিউ আর কোড এর মাধ্যমে পেমেন্ট এর ব্যবস্থা। চীনে মানিব্যাগ ব্যবহার করা এখন সেকেলে ব্যাপার, জাদুঘরে সংরক্ষণের বস্তু। এ দেশে ক্যাশলেস মানে শুধু স্মার্টনেস বা আধুনিকতা নয়, এ যেন স্বাভাবিক জীবন যাত্রা। আমাদের দেশে যদি ক্যাশলেস সিস্টেম চালু করা যায় তাহলে তা দুর্নীতির প্রবেশপথে কি তালা মারার চাইতে কিছু কম হবে? ভাববার অবকাশ আছে বৈ-কি।
লি-র সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এল চীনের আধুনিক কৃষি বিপ্লবের কথা। উষর মাটির সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তারা কীভাবে ভার্টিক্যাল ফার্মিং আর এগ্রি-টেক ব্যবহার করে মরুভূমিকেও শস্যশ্যামল করে তুলছে, তা শুনে নিজের দেশের পলিমাটির অফুরন্ত সম্ভাবনার কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। অবাক হয়ে শুনছিলাম আর কল্পনায় আমার বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন বুনে যাচ্ছিলাম।
একটি স্টুডিওতে বসে শুধু মাত্র একটি মোবাইল ফোন আর একটি একটি রিং-লাইট দিয়ে হাজার হাজার তরুণ লক্ষ লক্ষ টাকার পণ্য বিক্রি করছে যে দেশে, আমাদের দেশের পুরো একটি শপিং মল ও সে সুবিধা দিতে পারবে না। ডিজিটাল মার্কেটের এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কোথা থেকে শিখব আমরা!
ট্রেন পৌঁছে গেল চল্লিশ মিনিটেই। চীনের বুলেট ট্রেনের সেই স্থির কফির কাপটি আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেল- একটি দেশের সফল অর্থনীতি হলো স্থিতিশীলতা ও গতির মিশেল। বাংলাদেশেরও সেই মিশেল তৈরি করতে হবে। আমাদের আছে তরুণ শক্তি, ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃষি ও শিল্পের সম্ভাবনা। যা দরকার তা হলো, একটি সমন্বিত লজিস্টিক কৌশল, প্রযুক্তির সাহসী ব্যবহার, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-একটি উদ্যোক্তামুখী জাতীয় মানসিকতা।
পরবর্তী গন্তব্যে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। হঠাৎ অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, এত আধুনিক আর উন্নত একটা দেশ, অথচ রাস্তায় একটা ফ্যান্সি বাইক পর্যন্ত নেই। আমাদের দেশে খড়ের চালে থাকা ছেলাটাও ধার দেনা করে হলেও চার সাড়ে চার লক্ষ টাকার ফ্যান্সি বাইক হাঁকিয়ে ঘোরে! এসব করে চীন আমাদের কী শেখাতে চায়? ভাবনার জগতে কড়া নেড়ে কেউ একজন বলে উঠল, ‘ওরা শেখায়, কিভাবে নিঃশব্দে পরিচ্ছন্নভাবে একটি উন্নত দেশ গড়া যায়। চীন যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, উন্নয়ন মানে কালো ধোঁয়া আর শব্দ দূষণ নয় , উন্নয়ন মানে দৃষ্টীভঙ্গির পরিবর্তন।
চীন ভ্রমণ শেষে যখন দেশে ফিরছিলাম, রানওয়ের ঝিলমিল করা আলোগুলো আমাকে লি’র কথা মনে করিয়ে দিল। ওর বলা কিছু কথা আমার মাথায় তখনো ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেদিন ওর কথাগুলো আমি যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো গিলছিলাম। কিন্তু ওকে সেদিন বলা হয়নি, আমাদের দেশেও আছে কোটি কোটি লি আমাদেরও আছে কিউআর কোড আর মোবাইল ব্যাংকিং, শুধু লজিস্টিকস আর দুস্থ মানসিকতা আমাদের পা টেনে ধরেছে। আর এ দেশের কোটি তরুণের চোখে যে স্বপ্ন আমি দেখেছি, সেই সপ্নের সাথে বাস্তবে যদি ওদের মতো সিস্টেমেটিক চিন্তার মিলন ঘটে, সকল অভিযোগের কুশপুত্তলিকা দাহ করে যদি আমাদের প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি আর নেতৃত্বের সফল প্রয়োগ ঘটে প্রযুক্তির হাত ধরে, তাহলে একদিন ওদের মতো আমরাও সাফল্যকে স্পর্শ করব। সময়কে খাঁমচে ধরে, প্রযুক্তিকে আলিঙ্গন করে উদ্ভাবনী শক্তিতে বলিয়ান হয়ে একদিন আমরা হয়ে উঠব অনুকরণীয়। সেদিন নিশ্চয়ই আমরাও বুলেট ট্রেনের সেই কফি কাপের মতো স্থির ও গতিশীল অর্থনীতির একটি পরিচ্ছন্ন গল্প লিখব।
ফ্রিল্যান্স লেখক
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post