Print Date & Time : 1 May 2026 Friday 11:03 pm

শেষ সময়ে জমজমাট চট্টগ্রামের ঈদবাজার

চট্টগ্রাম ব্যুরো : ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শেষ সময়ে জমে উঠেছে বন্দরনগর চট্টগ্রামের ঈদবাজার। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নগরের অভিজাত শপিং মল থেকে শুরু করে ফুটপাতের দোকানÑসবখানেই এখন উপচেপড়া ভিড়। নতুন নতুন কালেকশন ঘিরে ক্রেতাদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। যার যার পছন্দ ও সাধ্যের মধ্যে ঈদের জন্য নতুন জামা, জুতা ও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সারছেন। ক্রেতারা বলছেন, এবার বাজারে চাহিদামতো নিত্যনতুন পোশাক পাওয়া যাচ্ছে। তবে দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এই বছরের বিক্রি বিগত বছরের তুলনায় বেশি বলে জানান বিক্রেতারা। এবারের ঈদ বাজারে দীর্ঘদিনের ভারতীয় পণ্যের দাপট কিছুটা ম্লান হয়েছে। এর পরিবর্তে পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও চীনের পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণ বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তানি থ্রিপিস। অন্যদিকে ছেলেদের পাঞ্জাবি, পায়জামা ও শার্টের পাশাপাশি শিশুদের হরেক ডিজাইনের পোশাকের বিক্রিও তুঙ্গে। তবে দেশি পণ্যের কদর বরাবরের মতোই বেশি। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন নামকরা ব্র্যান্ডের পোশাক ও শাড়ির চাহিদা এবং বিক্রিও বেশি।

শুক্রবার রাত ও গতকাল শনিবার নগরের বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, শাড়ি, থ্রিপিস, পাঞ্জাবি, ছিট কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল ও প্রসাধনী সামগ্রীর দোকানে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। বিক্রেতাদের ভাষ্য, রাত ৯টার পর থেকেই মার্কেটগুলোয় ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে এবং

অনেক জায়গায় তা রাত ৩টা পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে। তবে ইফতারের আগেও অনেক ক্রেতাকে কেনাকাটা করতে দেখা গেছে। পোশাকের ক্ষেত্রে নারী, পুরুষ ও শিশুদের জন্য রয়েছে নতুন সব কালেকশন। শিশুদের পোশাকের মধ্যে সারারা ও গারারার চাহিদা বেশি। পাশাপাশি থাইল্যান্ড, ভারত ও পার্সিয়ান ডিজাইনের বিভিন্ন ড্রেসও পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। নারীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তানি কাপড়। বয়সভেদে থ্রিপিস, লেহেঙ্গা ও শাড়ির বেচাকেনাও বেশ জমজমাট। অন্যদিকে পুরুষদের ঈদ কেনাকাটায় পাঞ্জাবির চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন ডিজাইন ও রঙের বৈচিত্র্যে ভরপুর পাঞ্জাবিতে সাজানো হয়েছে ঈদের বাজার।

আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, এবারের ঈদ বাজারে ভারত ও চীনের পণ্যের প্রভাব কিছুটা কমে গেছে। এর পরিবর্তে পাকিস্তান, তাইওয়ান ও থাইল্যান্ডের তৈরি পোশাক, মেয়েদের থ্রিপিস, জুতা, প্রসাধনী, শিশুদের পণ্য ও ফ্যাশন সামগ্রীর চাহিদা বেড়েছে। ভারতীয় পোশাকের দাম ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় ও ভারতীয় শাড়ির চাহিদাও বেশি। সিল্ক, কাতান, টাঙ্গাইল ও ভারতীয় কাঞ্জিলাল শাড়ি ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। বেঙ্গালুরু সিল্ক কাতান ও লেহেঙ্গার দাম ৮ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।

নিউমার্কেটের বিপণিবিতানে কেনাকাটা করতে আসা আসমা খাতুন জানান, ঈদে নতুন পোশাক না কিনলে আনন্দটাই যেন অপূর্ণ থাকে। তবে এ বছর পোশাকের দাম কিছুটা বেশি। তাই বাজেটের মধ্যে থেকে পছন্দের ড্রেস খুঁজে নিতে হচ্ছে। আরেক ক্রেতা মো. মেহেদী হাসান বলেন, পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছি। মার্কেটে অনেক ভিড়, তবে পোশাকের দাম আগের বছরের তুলনায় বেশি মনে হচ্ছে। তারপরও বাচ্চাদের জন্য কিছু কিনতেই হচ্ছে। নিউমার্কেট বিপণিবিতানের ‘নিউ ফ্যাশন কিং’ দোকানের বিক্রেতা সাব্বির আহমেদ জানান, ফারসি ও সারারা ড্রেসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। দাম ১৫০০ থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে রয়েছে। সুতির ড্রেসের দাম ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। গত বছরের তুলনায় এবার বিক্রি ভালো। ইফতারের পর ক্রেতার সমাগম বেশি থাকে। হকার মার্কেটের সদস্য সচিব জালাল উদ্দিন জানান, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের উৎসব বোনাস পাওয়ায় কেনাকাটার চাপ বেড়েছে।

নগরের বালি আর্কেডে কেনাকাটা করতে আসা মৌসুমি খাতুন বলেন, গত দুই বছর ঈদের কেনাকাটা তেমনভাবে করতে পারিনি। তাই এ বছর দাম একটু বেশি হলেও পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু পোশাক কিনে দিচ্ছি। তবে গত বছরের তুলনায় কাপড়ের দাম কিছুটা বেশি। আরও কয়েকজন ক্রেতা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার কাপড়ের দাম অনেক বেশি। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য পোশাক কেনা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বিক্রেতারা অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, বিশ্ববাজারে কাপড়ের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণেই পোশাকের দাম কিছুটা বেড়েছে। অন্যদিকে জুতার দোকানদাররা জানান, ঈদকে সামনে রেখে দোকানেও ক্রেতাদের উপস্থিতি বেড়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন ডিজাইনের জুতা ও স্যান্ডেল কিনছেন ক্রেতারা।

৭০ লাখ জনসংখ্যার এ মহানগরের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার রিয়াজউদ্দিন বাজার ও টেরিবাজার। বর্তমানে এ দুটি বাজারে ব্যবসায়ীদের দম ফেলার ফুরসত নেই। গত কয়েক দিনে টেরিবাজারে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাইকারি ও খুচরা ক্রেতার বিরামহীন ভিড় দেখা গেছে। টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান জানান, সারা বছর বেচাকেনা যা-ই হোক না কেন, ঈদকে কেন্দ্র করে প্রত্যেক ব্যবসায়ী বিশেষ প্রস্তুতি নেন। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা ছিল। কারণ, চট্টগ্রামে রেমিট্যান্সনির্ভর পরিবারে আর্থিক সংকট থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বেচাকেনা কমে যায়।

অন্যদিকে ঈদ কেনাকাটাকে ঘিরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে যানজটও। ক্রেতাদের অতিরিক্ত চাপের কারণে নিউমার্কেট, চকবাজার, প্রবর্তক, আন্দরকিল্লা, জিইসি মোড়, লালখান বাজার, সানমার সিটি, ষোলশহর, বহদ্দারহাট, সিইপিজেড এলাকা ও আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। ট্রাফিক বিভাগ সূত্র জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে। উৎসব মৌসুমে ছিনতাই, চুরি, উত্যক্ত করা ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরাও নিয়মিত টহল জোরদার করেছে।