Print Date & Time : 1 May 2026 Friday 12:59 am

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক: মহান মে দিবস আজ। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। ১৮৮৬ সালের এই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওইদিন তাদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের আত্মত্যাগের এই দিনকে তখন থেকেই সারা বিশ্বে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। এবারের মে দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। গতকাল বৃহস্পতিবার মহান মে দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ‘এক গৌরবোজ্জ্বল দিন’ বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এ দিবস সামনে রেখে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস পালিত হচ্ছে জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এ উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল শ্রমজীবী মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
শ্রমিকের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’ সময়োপযোগী হয়েছে বলে আমি মনে করি।
১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গের ইতিহাস স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাদের সেই আত্মত্যাগ শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজও আমাদের প্রেরণা ও শক্তি জোগায়।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার শ্রম আইন সংস্কার, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের যৌক্তিক মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে পেনশন ব্যবস্থা চালু, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, বন্ধ শিল্প চালু, ন্যায্যমূল্যে খাবার সরবরাহ, স্থায়ী শ্রমিক ও কর্মচারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতসহ শ্রমিক সমাজের ভাগ্যোন্নয়নে নানান কর্মসূচি ও নীতি গ্রহণ করেছে।
এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে বলেও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি।
দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় শ্রমজীবী মানুষের অবদান অপরিসীম মন্তব্য করে রাষ্ট্রপতি বলেন, শ্রমিকরাই হলো দেশের উন্নয়নের মূল কারিগর। শিল্প, কৃষি, নির্মাণসহ প্রতিটি খাতে তাদের নিরলস পরিশ্রম আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
মহান মে দিবস ও জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এক বাণীতে তিনি এই শুভেচ্ছা জানান।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ ও ‘মে দিবস’ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’Ñএই প্রতিপাদ্যের অন্তর্নিহিত প্রেরণাকে ধারণ করেই দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।
তিনি দেশে-বিদেশে কর্মরত সকল শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান এবং বলেন, জীবিকা নির্বাহ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।
প্রধানমন্ত্রী ১৮৮৬ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসসহ ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে জীবনদানকারী শ্রমিকদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একইসঙ্গে বিশ্বজুড়ে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান।
তিনি বলেন, শ্রমজীবী মানুষই একটি দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি। শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও অর্থনীতি গড়ে ওঠে। তাই শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সরকারের অঙ্গীকার।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছেÑশ্রমিক সমাবেশ, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
মহান মে দিবস উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় পত্রিকাসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো দিনটি উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান ও টকশো সম্প্রচার করবে।
‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ উপলক্ষে ১ মে (শুক্রবার) ঢাকায় সমাবেশ করবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গ সংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন। এদিন বিকেল ৩টায় রাজধানীর পল্টনস্থ বায়তুল মোকাররম দক্ষিণ গেটে এ সমাবেশের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন।
শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রচার সম্পাদক হাফিজুর রহমান জানান, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন।
মহান মে দিবসকে ঘিরে রাজধানীতে থাকছে নাট্যাঙ্গনের জমজমাট আয়োজন। বরাবরের মতো এবারও দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে আরণ্যক নাট্যদল। পাশাপাশি শিশুতোষ নাটকের বিশেষ প্রদর্শনী নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হচ্ছে নাট্যদল বটতলা। সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুরু হবে আরণ্যকের আয়োজনের প্রথম পর্ব। এতে থাকবে মে দিবসের গান, আবৃত্তি, বাউল সংগীত এবং একটি আলোচনা সভা। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। একই পর্বে মান্নান হীরা রচিত ও নির্দেশিত পথনাটক ‘মূর্খ লোকের মূর্খ কথা’ মঞ্চস্থ হবে।
এদিন সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে শুরু হবে দ্বিতীয় পর্ব। এখানে সংগীত পরিবেশনার পর মঞ্চে উঠবে আরণ্যকের জনপ্রিয় নাটক ‘রাঢ়াঙ’। নাটকটি রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন মামুনুর রশীদ। এ আয়োজন উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও প্রকাশিত হবে ‘মে দিবসের কাগজ’।
অন্যদিকে নাট্যদল বটতলা আয়োজন করেছে শিশুতোষ নাটক ‘বন্যথেরিয়াম’-এর দুটি প্রদর্শনী। বেইলি রোডের বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট ও সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে মঞ্চস্থ হবে নাটকটি। সুকুমার রায়ের ‘হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি’ অবলম্বনে নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন ইভান রিয়াজ।
নাটকটির গল্পে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত প্রাণিকে ঘিরে মানুষের লোভ, ব্যবসায়িক মনোভাব এবং প্রকৃতি ধ্বংসের প্রবণতা। বিনোদনের পাশাপাশি এতে রয়েছে পরিবেশ ও মানবিক বার্তা, যা শিশুদের পাশাপাশি বড়দেরও ভাবাবে।
দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক সমাবেশ করবে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দুপুর ২টায় এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম জনসভা হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ উপলক্ষে শ্রমিক দলের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং ব্যানার-ফেস্টুনসহ সার্বিক আয়োজন সম্পন্ন করা হচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের শ্রমজীবী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশে অংশ নেবেন এবং তাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরবেন। সমাবেশে বর্তমান শ্রম পরিস্থিতি ও জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা এবং শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখবেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী শফুসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।