আনোয়ার হোসাইন সোহেল : ইরান যুদ্ধ আর নতুন সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশে তৈরি পোশাক রপ্তানি নিয়ে ‘মাঝারি মানের’ পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ প্রধান রপ্তানির বাজারগুলোয় রপ্তানি বাড়ানোর যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমনই পোশাকের চাহিদা বা রপ্তানির আদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ দেশভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে একধরনের পরিবর্তনশীল প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ সময়ে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কম।
পোশাক খাত বিশ্লেষকদের মতে, এই পতন কোনো বড় সংকটের ইঙ্গিত নয়; বরং বৈশ্বিক ভোক্তা চাহিদার পরিবর্তনের কারণে খাতটি একটি ‘রিসেট’ বা পুনর্মূল্যায়নের দিকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যেখানে মোট রপ্তানির ৪৯ শতাংশ যায়। আলোচ্য সময়ে এই বাজারে রপ্তানি ৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলারে। ইউরোপে ভোক্তা আচরণে পরিবর্তন ও ব্যয়ের চাপ, এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। দেশটিতে যায় মোট রপ্তানির ২০ শতাংশ। এখানে রপ্তানি কমেছে তুলনামূলক কমেছে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আলোচিত সময়ে মোট আয় হয়েছে ৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। এটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা নির্দেশ করলেও ক্রেতাদের পছন্দ ও চাহিদায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে রপ্তানি ১ দশমিক ৬১ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ইউরোপীয় বাজারের সামগ্রিক প্রবণতার প্রতিফলন। অন্যদিকে কানাডায় প্রায় স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ হ্রাস, যা ভবিষ্যতে বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে (জুলাই-মার্চ ২০২৫-২৬) পোশাক রপ্তানি পরিমাণ কমে দাড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছর (জুলাই-মার্চ ২০২৪-২৫) একই সময়ে ছিল ৫ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার। তবে বিশেষজ্ঞরা এটিকে ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে নতুন করে বাজার কৌশল সাজানোর প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখছেন। এসব বাজারে প্রবেশ ও সমপ্রসারণে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিটওয়্যার রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক কমেছে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এই প্রবণতা পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, উচ্চমূল্য সংযোজন এবং নতুন ডিজাইনে বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
পোশাক খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, সামপ্রতিক এই পরিসংখ্যান বৈশ্বিক ভোগব্যয়ের পরিবর্তনের প্রতিফলন। ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এখন নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি, যেখানে শুধু কম দামে পণ্য সরবরাহ করলেই হবে না— বরং গুণগত মান, টেকসই উত্পাদন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—প্রচলিত বাজারে ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করা। নতুন বাজারে প্রবেশে কৌশলগত উদ্যোগ নেওয়া। প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উত্পাদনে জোর দেওয়া।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এটি কোনো সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক বাজারের একটি স্বাভাবিক সমন্বয় প্রক্রিয়া। এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে শিল্পকে আরও আধুনিক, টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে হবে।’
সার্বিকভাবে বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সম্ভাবনার নতুন দুয়ারও খুলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাঠত্ করে আমাদের পোশাকের বাজারে এই ধাক্কার বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান শেয়ার বিজকে বলেন, মূলত তিনটি কারণে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তারি বাজারে কিছুটা ধাক্কা লেগেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, আমাদের রপ্তানির বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন ট্যারিফ বসানো। এতে সেখানার ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতা কিছুটা কমে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে আমাদের বিক্রিতে। দ্বিতীয়ত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনের ফলেও আমাদের পোশাক রপ্তানিতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তৃতীয়ত, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চিত একটা পরিস্থিতি থাকায় আমাদের অনেক বায়ার প্রতিবেশী ভারত ও চায়না চলে গেছে, যে কারণে আমাদের রপ্তানি বাজার কিছুটা নেগেটিভ হয়েছে।
তবে চলতি অর্থবছরে শেষের দিকে রপ্তানি আয় কমে গেলেও বিজিএমইএ সভাপতি আশাপ্রকাশ করেন, যেহেতু দেশে এখন একটি বিনিয়োগ বান্ধব রাজনৈতিক সরকার এসেছে সেকারণে আবারও পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। তবে সামপ্রতিক ইরান- ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে পোশাক রপ্তানি থেকে বিশ্বের সব রপ্তানিকারক দেশেরই আয় কমতে পারে।
গত ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ব্যালান্স অব পেমেন্টসে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।
তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার, গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১৩ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূলত দেশে আমদানি বেড়ে যাওয়া ও রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। এ সময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের দুর্বল রপ্তানি এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক কারণে তীব্র মন্থরতার প্রভাবেই এ সংকোচন দেখা দিয়েছে, বলছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশের আমদানি আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে রপ্তানি আশানুরূপ হচ্ছে না, ফলে বাণিজ্য ঘাটতি আগের চেয়ে তিন বিলিয়নের বেশি বেড়েছে।’
জাহিদের হোসেন বলেন, এই ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ। তিনি বলেন, ‘এটাই সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য যে প্রায় ১৭ বিলিয়নের ওপরে বাণিজ্য ঘাটতি, যেখানে এক বছরের ব্যবধানে তিন বিলিয়নের ওপর বেড়েছে, তবুও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সে ঘাটতি এক বিলিয়ন ডলারের ঘরে আছে। ‘এটার প্রধান কারণ হচ্ছে রেমিট্যান্স বেশি এসেছে। নতুবা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সে ঘাটতি আরও বেশি থাকতে পারত।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আমদানি হয়েছে ৪৬ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময় ছিল ৪৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ এক বছরের মধ্যে আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।
