Print Date & Time : 26 April 2026 Sunday 5:29 am

সংকটে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অপূর্ণ

এফ আই মাসউদ: দীর্ঘদিনের লোকসান, পুরোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার, কাঁচামালের সংকট এবং উৎপাদন অদক্ষতার চাপে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্প আজ বড় ধরনের সংকটে রয়েছে। একসময় দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি এবং শিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সরকারি চিনিকলগুলো এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাড়ছে না দক্ষতা, বরং বছর বছর কমছে আখ মাড়াই, কমছে চিনি উৎপাদন এবং ব্যাহত হচ্ছে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।
চলতি মাড়াই মৌসুমেও সেই একই চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) আওতাধীন ৯টি চিনিকলের জন্য এ মৌসুমে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫১ হাজার ৮৫৭ টন। তবে মৌসুম শেষে উৎপাদন হয়েছে ৪৩ হাজার ৩২৬ টন। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫৩১ টন, যা ১৬ শতাংশের বেশি।
শুধু লক্ষ্যমাত্রাই নয়, আগের মৌসুমের তুলনায়ও উৎপাদন কমেছে। গত মৌসুমে এসব চিনিকলে মোট ৪৬ হাজার ১৮৭ টন চিনি উৎপাদিত হয়েছিল। সে হিসাবে এবার উৎপাদন কমেছে ২ হাজার ৮৬১ টন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯টি চিনিকলের মধ্যে মাত্র দুটি মিল লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ঠাকুরগাঁও সুগার মিলে ৫ হাজার ৬৭০ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার ৮৩৬ টন। একইভাবে জিলবাংলা সুগার মিলে ৪ হাজার ৯০০ টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার ৩৬৮ টন।
সবচেয়ে বেশি চিনি উৎপাদন হয়েছে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে, যেখানে উৎপাদনের পরিমাণ ৯ হাজার ৬৫৪ টন। বিপরীতে সবচেয়ে কম উৎপাদন হয়েছে জয়পুরহাট সুগার মিলে, যেখানে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৮০১ টন।
চলতি মৌসুমে প্রথম মাড়াই কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে। সর্বশেষ ২৬ ডিসেম্বর মাড়াই শুরু হয় জয়পুরহাট সুগার মিলে। আর ২০২৬ সালের ৫ মার্চ জিলবাংলা সুগার মিলে মাড়াই শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে মৌসুমের কার্যক্রম শেষ হয়।
মাড়াই দিনের হিসাবেও পিছিয়ে রয়েছে চিনিকলগুলো। চলতি মৌসুমে ৯টি চিনিকলে মোট মাড়াই হয়েছে ৬৪৩ দিন, যেখানে আগের মৌসুমে এ সংখ্যা ছিল ৬৬৩ দিন। অর্থাৎ এবার ২০ দিন কম মাড়াই হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ১০৮ দিন মাড়াই হয়েছে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে। অন্যদিকে জয়পুরহাট ও রাজশাহী সুগার মিলে সবচেয়ে কম ৪৫ দিন করে মাড়াই হয়েছে।
চলতি মৌসুমে মোট ৮ লাখ ৫০ হাজার টন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বাস্তবে মাড়াই হয়েছে ৭ লাখ ৮২ হাজার ৬৭৩ টন। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৬৭ হাজার ৩২৭ টন আখ কম মাড়াই হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চিনি উৎপাদনে।
যদিও চিনি আহরণের হার সামান্য বেড়েছে। চলতি মৌসুমে আখ থেকে চিনি আহরণের হার ছিল ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা আগের মৌসুমে ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এই হার মোটেও সন্তোষজনক নয়। তাদের মতে, অন্তত আট শতাংশ বা তার বেশি আহরণ হার হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন কমার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উন্নত জাতের আখের সংকট অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে নতুন ও উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনে অগ্রগতি না থাকায় পুরোনো জাতের আখ দিয়েই উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এছাড়া আখ চাষ, সংগ্রহ, পরিবহন ও মাড়াই প্রক্রিয়ায় আধুনিক পদ্ধতির অভাবও উৎপাদন কমার কারণ।
চিনিকলগুলোর পুরোনো যন্ত্রপাতিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ চিনিকলের আয়ুষ্কাল শেষ হলেও সেগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে চালু রাখা হয়েছে। ফলে উৎপাদন দক্ষতা কমে যাচ্ছে।
চলতি মৌসুমে কোনো চিনিকলেরই চিনি আহরণের হার সাত শতাংশে পৌঁছায়নি। সবচেয়ে বেশি আহরণ হয়েছে জিলবাংলা সুগার মিলে, যেখানে হার ছিল ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ঠাকুরগাঁও চিনিকলে এ হার ৬ দশমিক ১ শতাংশ। সবচেয়ে কম আহরণ হয়েছে মোবারকগঞ্জ চিনিকলে, যেখানে হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। জয়পুরহাট চিনিকলে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
সূত্র জানায়, দেশে মোট ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ১০টিরই আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে। বর্তমানে মাত্র ৯টি চিনিকল উৎপাদনে রয়েছে। ২০২১-২২ মৌসুমে পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, রংপুর, শ্যামপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়াÑএই ছয়টি চিনিকল বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে চিনিকল আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের চুক্তি বাতিল করা হয় এবং বন্ধ মিল চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ না থাকায় সেগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। ফলে বন্ধ মিলগুলোর যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিএসএফআইসি সচিব মুজিবুর রহমান বলেন, একসময় সাড়ে সাত থেকে আট শতাংশের বেশি হারে চিনি আহরণ করা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হার কমেছে। আধুনিকায়ন করা গেলে উৎপাদন ও আহরণ দুইই বাড়ানো সম্ভব।
তিনি কেরু সুগার মিলের উদাহরণ দিয়ে জানান, সেখানে মিল হাউস ও বয়লার পরিবর্তনের পর চিনি আহরণের হার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। একই ধরনের সংস্কার অন্য মিলগুলোতেও করা গেলে উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। ভালো জাতের আখের সংকট কাটানো না গেলে কাক্সিক্ষত উৎপাদন অর্জন কঠিনই থেকে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) নিতাই চন্দ রায় বলেন, বাংলাদেশে চালু ৯টি সরকারি চিনিকলের মধ্যে একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান হলো কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। এ প্রতিষ্ঠানের লাভের মূল কারণ পণ্য বহুমুখীকরণ। আখ থেকে উৎপাদিত চিনির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অনেক আয় করে। আখ থেকে চিনি উৎপাদনের পর উপজাত হিসেবে পাওয়া চিটাগুড়, ব্যাগাস ও প্রেসমাড থেকে বিভিন্ন মূল্যবান পণ্য উৎপাদন হয় চিনিকলটির।
তিনি মনে করেন, চিনিকলগুলোর প্রধান সমস্যা কাঁচামাল বা মাড়াইযোগ্য আখের অভাব। তাছাড়া হেক্টরপ্রতি আখের কম ফলন। পৃথিবীর অন্যান্য চিনি উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় চিনি আহরণ হারও কম। দেশে বেশি আহরণ করা যায় এমন জাতের আখও কম। পুরোনো যন্ত্রপাতির ব্যবহার থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংরক্ষণ এমনকি প্রক্রিয়াজাত ভালো হয় না। ফলে প্রক্রিয়াজাতের খরচও বাড়ে। যে পরিমাণ আখ আমরা আহরণ করি, তার বিপরীতে বিক্রিমূল্য অনেক কম। এমন আরও বহু সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। শুধু পরিকল্পনা নিলেই হবে না, এর বাস্তবায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশে ১৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রয়েছে, যা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হয়। তবে দীর্ঘ লোকসানের কারণে ৬টি চিনিকলে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে এই খাতটি সংকটে থাকলেও সরকার নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলসসহ ৯টি চিনিকল চালুর মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এদিকে বন্ধ হওয়া ওই ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল চালু করার দাবি জানিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটি।