Print Date & Time : 24 May 2026 Sunday 2:33 am

সংকট, সম্ভাবনা ও বাস্তবতার জটিল সমীকরণ

অধ্যাপক আল-আমিন: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোরবানির ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিবছর কোরবানির ঈদ ঘিরে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। গরু-ছাগলের হাট, পরিবহন, খাদ্যশিল্প, চামড়া খাত, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পোশাক ও ব্যাংকিং লেনদেন থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে এই ঈদের প্রভাব পড়ে। এমনকি দেশের সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাও ঈদকেন্দ্রিক চাহিদার ওপর নির্ভর করে নতুন গতি পায়।

কিন্তু এবার কোরবানির ঈদ আসছে এক ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা এবং সাধারণ মানুষের কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের ঈদ। এরই মধ্যে সামনে আসছে নতুন জাতীয় বাজেট। ফলে কোরবানির ঈদ ও জাতীয় বাজেটÑদুই বিষয় এখন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এবারের বাজেট শুধু একটি বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনা নয়; বরং এটি হবে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে জনগণকে কতটা স্বস্তি দেওয়া সম্ভব, তার একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি কমানো, কৃষক ও খামারিদের সুরক্ষা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়ক পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোরবানির ঈদের প্রভাব অত্যন্ত বড়। এই সময় শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বর্তমানে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাপে রয়েছে। ফলে এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বস্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষ করে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ, পশু খামারিদের জন্য সহজ ঋণ, পরিবহন খাতে নজরদারি এবং চামড়াশিল্পকে পুনরুদ্ধারে সুস্পষ্ট নীতি প্রয়োজন। অন্যথায় ঈদকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে প্রতি বছর কয়েক লাখ পশু বিক্রি করা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খামারিরা সারা বছর ধরে এই ঈদকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নেন। অনেক পরিবারের জন্য কোরবানির পশু বিক্রিই বছরের প্রধান আয়। ফলে ঈদের বাজার শুধু শহরের অর্থনীতিকে নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিকেও সচল রাখে।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণ পাওয়ার জটিলতায় অনেক খামারি চাপে পড়েছেন। অনেকে উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যদি খামারিদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ, পশুখাদ্যে ভর্তুকি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কোরবানির পশুর বাজার স্থিতিশীল থাকবে। এতে একদিকে খামারিরা লাভবান হবেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও তুলনামূলকভাবে কম দামে পশু কিনতে পারবেন।

এদিকে মূল্যস্ফীতি এখন দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। বাজারে চাল, ডাল, তেল, মাংস, পেঁয়াজসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। এই বাস্তবতায় ঈদকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত খরচ অনেক পরিবারের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে।

আসন্ন বাজেটে যদি বাস্তবভিত্তিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে ঈদের বাজার আরও অস্থির হতে পারে। কারণ ঈদের আগে ব্যবসায়ীরা অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এ ছাড়া পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

বাংলাদেশের বাজেটের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাস্তবায়নের দুর্বলতা। কাগজে-কলমে অনেক ভালো পরিকল্পনা থাকে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। এবারের বাজেটে যদি সত্যিকার অর্থে বাজার মনিটরিং, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে জনগণ কিছুটা স্বস্তি পাবে।কোরবানির ঈদকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত খাতগুলোর একটি হলো চামড়াশিল্প। বাংলাদেশে কোরবানির সময় বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়। একসময় এই খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বড় উৎস ছিল। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেট, মূল্য নির্ধারণে অনিয়ম এবং ট্যানারি খাতের দুর্বলতার কারণে চামড়াশিল্প এখন বড় সংকটে রয়েছে।

প্রতিবছর দেখা যায়, কোরবানির পর চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়ায় অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হন। কোথাও কোথাও চামড়া নষ্ট হয়ে যায়, আবার অনেক সময় ব্যবসায়ীরা কম দামে চামড়া কিনে অতিরিক্ত মুনাফা করেন। ফলে প্রকৃত উপকারভোগী হওয়া উচিত যারা, সেই এতিমখানা, মাদরাসা ও সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হন।

চামড়াশিল্পকে বাঁচাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বাজেটে এ খাতের আধুনিকায়ন, পরিবেশবান্ধব ট্যানারি উন্নয়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঈদ একটি বড় ভোক্তাচালিত প্রবাহ তৈরি করে। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, অনলাইন বাণিজ্যÑসব খাতেই ঈদের সময় লেনদেন বাড়ে। কিন্তু এবার সাধারণ মানুষের ব্যয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সেই প্রবাহ কিছুটা ধীর হতে পারে।

বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে। ফলে অনেকেই আগের মতো ঈদে অতিরিক্ত কেনাকাটা করতে পারছেন না। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাজারে সামগ্রিক ভোগব্যয় কমিয়ে দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যেও।

এদিকে সরকারও এখন রাজস্ব সংকটে রয়েছে। ডলার সংকট, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে বাজেট প্রণয়নে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। ফলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এবারের বাজেট হবে এক ধরনের ‘সামঞ্জস্যের বাজেট’। যেখানে একদিকে জনগণকে স্বস্তি দিতে হবে, অন্যদিকে রাজস্ব আয়ও নিশ্চিত করতে হবে।

অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প কমিয়ে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে বিশেষ সহায়তা দেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি এখনো তার তরুণ জনগোষ্ঠী এবং অভ্যন্তরীণ বাজার। যদি সঠিক নীতি গ্রহণ করা যায়, তাহলে বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তবে এজন্য প্রয়োজন দুর্নীতি কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবহন খাত। প্রতিবছর ঈদের সময় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যানজট, টিকিট সংকট, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। এতে সাধারণ মানুষ যেমন ভোগান্তিতে পড়েন, তেমনি পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে কোরবানির পশু পরিবহনের ক্ষেত্রে পথে পথে অবৈধ চাঁদা আদায়, অতিরিক্ত ভাড়া এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে পশুর দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই সরকারকে পরিবহন খাতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

ঈদকে সামনে রেখে সড়ক, নৌ ও রেলপথে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ যেন না থাকে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিআরটিএ, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কোরবানির পশুবাহী ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস, লঞ্চ ও ট্রেন চলাচলে স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে এবং বাজার ব্যবস্থাও স্থিতিশীল থাকবে।

এছাড়া জুলাই মাসে সম্ভাব্য পে স্কেল বৃদ্ধি নিয়েও জনমনে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে বেতন কাঠামো পরিবর্তন বা পে স্কেল বৃদ্ধির প্রক্রিয়া যেন বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। অনেক সময় বেতন বৃদ্ধির আলোচনা শুরু হলেই ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপরই পড়ে। তাই পে স্কেল বাস্তবায়নের আগে ও পরে বাজার মনিটরিং, নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর তদারকি প্রয়োজন।

মানুষের আয় বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি সেই আয় যাতে মূল্যস্ফীতির চাপে অকার্যকর হয়ে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করা দরকার। পে স্কেল বৃদ্ধি যদি বাজার নিয়ন্ত্রণের কার্যকর নীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু যথাযথ তদারকি না থাকলে এর সুযোগ নিয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই সরকারকে এখনই কঠোর অবস্থান নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই নতুন করে ভোগান্তির শিকার না হন।

সব মিলিয়ে আসন্ন কোরবানির ঈদ এবং জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। একদিকে জনগণের প্রত্যাশা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতাÑএই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবহন খাতে সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজি বন্ধ, ঈদযাত্রায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কোরবানির পশু পরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জুলাই মাসে সম্ভাব্য পে স্কেল বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে বাজারে যেন নতুন অস্থিরতা তৈরি না হয়Ñএসব বিষয়ে সরকারকে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।

এবারের বাজেটে যদি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খামারিদের সুরক্ষা, চামড়াশিল্প পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা এবং বাজার তদারকির কার্যকর পদক্ষেপ থাকে, তাহলে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অন্যথায় কোরবানির ঈদ সাময়িক অর্থনৈতিক গতি তৈরি করলেও দীর্ঘ মেয়াদে জনগণের চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই এবারের বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি হবে সাধারণ মানুষের স্বস্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনীতির দিকনির্দেশনার বড় পরীক্ষা।