নিজস্ব প্রতিবেদক : কর্মীদের আয়করের দায় থেকে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানকে অব্যাহতি, করপোরেট কর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর আরোপিত শুল্ক-ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব)।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক্-বাজেট আলোচনায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নোয়াব সভাপতি, মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এ সময় প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রাক্-বাজেট আলোচনায় নোয়াব সভাপতি বলেন, ‘আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা নিজ নিজ আয়কর নিজেরাই পরিশোধ করেনÑএটি একটি মৌলিক নীতি। কিন্তু সংবাদপত্র ওয়েজ বোর্ডের বিধান অনুযায়ী কর্মীদের আয়ের ওপর প্রযোজ্য আয়কর প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হয়, যা অন্যান্য খাতের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, দেশে এমন কোনো আইন থাকা উচিত নয় যা সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য নয়। এই বৈষম্যমূলক বিধান সংশোধন করা জরুরি।’
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘বাস্তবতার নিরিখে ট্যাক্স দেওয়ার দায়িত্ব কর্মীদেরই হওয়া উচিত এবং বেতন থেকেই আয়কর কর্তন করা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। তিনি জানান, ভবিষ্যতে নতুন ওয়েজ বোর্ড গঠনের সময় বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে, যাতে এই নীতিগত অসামঞ্জস্য দূর করা যায়।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে বেতন কাঠামোয় প্রভাব পড়তে পারে। আগে যদি প্রতিষ্ঠান কর্মীদের ট্যাক্স বহন করে থাকে, নতুন ব্যবস্থায় কর্মীদের নিজস্ব আয়ের ওপর কর দিতে হলে স্বাভাবিকভাবেই বেতন বাড়ানোর দাবি উঠতে পারে।
নোয়াবের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের রপ্তানিমুখী ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অনেক শিল্প খাতে বর্তমানে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে করপোরেট কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ সংবাদপত্র শিল্প, যা সমাজ গঠন ও গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বর্তমান আর্থিক সংকট, বিজ্ঞাপন আয়ের হ্রাস এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সংবাদপত্র শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে করপোরেট কর হার কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, করপোরেট করের হার কমানো একটি জটিল বিষয়। কারণ সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে হয়। তবে তিনি আশ্বাস দেন, করের হার আর বাড়ানো হবে না এবং বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে।
নোয়াবের প্রস্তাবে বলা হয়, সংবাদপত্র শিল্পের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্ট আমদানিনির্ভর হওয়ায় এর ওপর আরোপিত বিভিন্ন কর শিল্পটির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে ৩ শতাংশ শুল্ক, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এটিসহ বিভিন্ন কর দিতে হয়। এতে পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয়সহ নিউজপ্রিন্টের ল্যান্ডেড কস্ট প্রায় ১৩০ থেকে ১৩২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা সংবাদপত্র শিল্পের টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় অন্তত আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করা দরকার।
এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ভ্যাট-সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে বেশ কিছু যৌক্তিকতা রয়েছে এবং সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। তিনি সংশ্লিষ্ট বাজেট টিমকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ তৈরির নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান।
আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বাড়াতে নতুন কর কাঠামো নিয়ে ভাবনার কথাও তুলে ধরে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সারচার্জের পরিবর্তে সম্পদ কর (ওয়েলথ ট্যাক্স) পুনরায় চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে সম্পদশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে আয়করের বাইরে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করা যায়। একই সঙ্গে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির ওপর কর আরোপের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত এ ব্যবস্থার আলোকে বাংলাদেশেও নির্দিষ্ট উচ্চমূল্যের সম্পত্তি বিশেষ করে সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত সম্পদের মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেকেই পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে বিপুল সম্পদ পান। এই সম্পদ হস্তান্তরের সময় একটি নির্দিষ্ট কর আরোপ করা গেলে তা রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে দুর্নীতি ও ফাঁকফোকর বন্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব লিকেজ কমবে এবং আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তিনি জানান, ব্যবসা সহজীকরণ ও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের লক্ষ্যে কাস্টমস ব্যবস্থায় অটোমেশন জোরদার করা হয়েছে। ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর পাশাপাশি বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমও অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহƒত কাঁচামালের ইউটিলাইজেশন পারমিট এখন অনলাইনে ইস্যু করা হচ্ছে। ফলে সময় ও ব্যয় উভয়ই কমছে।
অডিট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ম্যানুয়াল পদ্ধতি বাতিল করে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শতভাগ অনলাইন আয়কর রিটার্ন নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াবে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। রাজস্ব সংগ্রহ আরও বাড়াতে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস খাতে পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলমান সংস্কার ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে নতুন গতি আসবে।
