নিজস্ব প্রতিবেদক : সঞ্চয়পত্র কেনাবেচার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আয়োজিত ‘বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিকমেনডেশন’ শীর্ষক সেমিনারে এ তথ্য জানান অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।
অর্থসচিব বলেন, সঞ্চয়পত্র কেনাবেচার ক্ষেত্রে সরকার নীতিগতভাবে নতুন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা বিবেচনা করছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সঞ্চয়পত্র কেনার সীমা তুলে দেওয়া। এই উদ্যোগ সঞ্চয়পত্র বাজারে বিনিয়োগের পরিসর বাড়াবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, বন্ড লেনদেন প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে দেশের বন্ড বাজারের আকার ৬ ট্রিলিয়ন টাকা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ কিংবা বন্ড বাজারের মাধ্যমে অর্থায়নের দিকে ঝুঁকবে।
গভর্নর আরও বলেন, বন্ড বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সুদের হার কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। একক সুদের হার কাঠামো কার্যকর করা গেলে দেশের বন্ড বাজার টেকসই ভিত্তি পাবে।
তিনি বলেন, দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য বন্ড মার্কেট একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। তবে উন্নয়নশীল ও সমমনা অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে করপোরেট ও পাবলিক সেক্টর এখনও অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল, যা অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রক্রিয়াগুলো বাজারবান্ধব না হওয়ায় অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে না এসে সহজলভ্য ব্যাংক ঋণের দিকেই ঝুঁকছে বলে সেমিনারে উল্লেখ করা হয়।
পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিএসইসির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগ ও বিএসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
যৌথ কমিটির তত্ত্বাবধানে বন্ড মার্কেট উন্নয়নের জন্য একটি ধারণাপত্র প্রস্তুত করা হয়। এতে বন্ড বাজার উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে সীমিত সংখ্যক করপোরেট বন্ড, বন্ড ইস্যুতে উচ্চ ব্যয়, দুর্বল ক্রেডিট রেটিং ব্যবস্থা, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, দুর্বল বাজার অবকাঠামো, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও সচেতনতার ঘাটতির বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি কর্মপরিকল্পনাও ধারণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন এবিবির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের ডিন ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম, বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ বিভিন্ন আর্থিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক বাজারে সঞ্চয়পত্র ও বন্ড খাতের গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন।
একক গ্রাহক ঋণ সীমা হলো ব্যাংকের মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। গভর্নর বলেন, মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি কাউকে এককভাবে ঋণ দিতে পারবে না ব্যাংক। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণ হবে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ আর নন-ফান্ডেড ঋণ সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ সবুজ অর্থায়ন ক্ষেত্রে এই সীমা শিথিল থাকবে। ঋণসীমা অতিক্রম না করতে দেওয়ার এ পদ্ধতিকে পুশ ফ্যাক্টর হিসেবে বর্ণনা করে আহসান মনসুর বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠান যেন বন্ড মার্কেটে আসে, সে জন্য তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। বন্ড ইস্যুতে সময় কমানো, খরচ কমানো ও বিনিয়োগকারীর জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post