নিজস্ব প্রতিবেদক : সদ্য বিদায় নেওয়া ২০২৫ সালে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত, ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছে। রেলপথে ৫১৩টি দুর্ঘটনায় ৪৮৫ জন নিহত, ১৪৫ জন আহত হয়েছে। নৌ-পথে ১২৭টি দুর্ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত, ১৩৯ জন আহত এবং ৩৮ জন নিখোঁজ রয়েছে। এ বছর ২ হাজার ৪৯৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৩ জন নিহত ও ২ হাজার ২১৯ জন আহত হয়েছে। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৭.০৪ শতাংশ, নিহতের ৩৮.৪৬ শতাংশ ও আহতের ১৪.৯৮ শতাংশ। সড়ক, রেল ও নৌ-পথে সর্বমোট ৭ হাজার ৩৬৯টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৭৫৪ জন নিহত এবং ১৫ হাজার ৯৬ জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল রোবাবর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেন, এসব দুর্ঘটনায় বছরে আর্থিক ক্ষতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি। দুর্ঘটনায় প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক নিরাপত্তা ও উন্নত গণপরিবহনের অঙ্গীকার দাবি করেছে সংগঠনটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ১৯০ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ১ হাজার ৬৯১ জন চালক, ১ হাজার ২১৬ জন পথচারী, ৫৫১ জন পরিবহন শ্রমিক, ৮৩২ জন শিক্ষার্থী, ১২৯ জন শিক্ষক, ১ হাজার ৫৬ জন নারী, ৬২২ জন শিশু, ৬৯ জন সাংবাদিক, ১৫ জন চিকিৎসক, ১১ জন বীরমুক্তিযোদ্ধা, ৫ জন আইনজীবী ও ৯ জন প্রকৌশলী এবং ১৪১ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে।
এর মধ্যে ৩৫ জন পুলিশ সদস্য, ২০ জন সেনা সদস্য, ০১ জন নৌবাহিনী সদস্য, ০৩ জন আনসার সদস্য, ০২ র্যাব সদস্য, ০২ জন ফায়ার সার্ভিস সদস্য, ০৩ জন বিজিবি সদস্য, ১০ জন বীরমুক্তিযোদ্ধা, ১৪ জন সাংবাদিক, ৪১৫ জন নারী, ৫৪৬ জন শিশু, ৬৩৩ জন শিক্ষার্থী, ১২২ জন শিক্ষক, ১৫৫৭ জন চালক, ২১৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ০৯ জন প্রকৌশলী, ০৫ জন আইনজীবী, ১০৩ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ১৪ জন চিকিৎসক ও ১১৪৬ জন পথচারী নিহত হয়েছে।
এ সময়ে সংগঠিত দুর্ঘটনায় সর্বমোট ১ হাজার ২৮৮টি যানবাহনের পরিচয় মিলেছে, যার ১৪.৪৯ শতাংশ বাস, ২২.৬০ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান ও লরি, ৫.৮৫ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস, ৬.৬৩ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ২৮.৪৮ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৩.৫৪ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, ৮.৩৮ শতাংশ নছিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর ও লেগুনা সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দুর্ঘটনা ভয়াবহ বাড়লেও এসব সংবাদ গণমাধ্যমে কম আসছে বলে প্রকৃত চিত্র তুলে আনা যাচ্ছে না।
দুর্ঘটনায় সংগঠিত যানবাহনের ১.০৪ শতাংশ বাস, ০.৯৯ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১.০৬ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ১.০১ শতাংশ নসিমন-মাহিন্দ্রা-লেগুনা সড়কে দুর্ঘটনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ০.৭৩ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-লরি, ৩.০২ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক, ০.৩৬ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস সড়কে দুর্ঘটনা বিগতবছরের চেয়ে কমেছে।
সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪৮.৮৪ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা, ২৬ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৮.৬৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৫.৩৭ শতাংশ বিবিধ কারণে, ০.৪৪ শতাংশ যানবাহনের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে এবং ০.৬৮ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে মোট সংগঠিত দুর্ঘটনার ৩৮.২২ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৭.১৩ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৮.৮৩ শতাংশ ফিডার রোডে সংগঠিত হয়েছে। এছাড়াও দেশে সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ৪.২২ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, ০.৬৮ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংগঠিত হয়েছে।
বিদায়ী বছরে ছোট যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও এসব যানবাহন অবাধে চলাচলের কারণে জাতীয় মহাসড়কে ২.৫৫ শতাংশ, আঞ্চলিক মহাসড়কে ৫.৪৭ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এবার ফিডার রোডে ৬.৯৮ শতাংশ, ঢাকা মহানগরীতে ০.৭১ শতাংশ, ০.৩ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, রেলক্রসিং-এ ০.০৫ শতাংশ দুর্ঘটনা কমেছে।
প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়Ñবেপরোয়া গতি, বিপদজনক অভারটেকিং, সড়কের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন। চালক, যাত্রী, পথচারী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা ও ট্রাফিক আইন সংক্রান্ত অজ্ঞতা, পরিবহন চালক ও মালিকের বেপরোয়া মনোভাব, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো। এছাড়া অরক্ষিত রেলক্রসিং, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে দুর্নীতি, ট্রাফিক আইন অমান্য করা, রোড সাইন ও রোড মার্কিং না থাকাকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আরও উল্লেখ করা হয়, সড়কে চাঁদাবাজি, রাস্তার ওপর হাট-বাজার, মালিকের অতিরিক্ত মুনাফার মানসিকতা, চালকের নিয়োগ ও কর্মঘণ্টা সুনির্দিষ্ট না থাকা, সড়কে আলোকসজ্জা না থাকা, রোড ডিভাইডার পর্যাপ্ত উঁচু না থাকা, সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি না থাকা, দেশব্যাপী নিরাপদ, আধুনিক ও স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে টুকটুকি-ইজিবাইক-ব্যাটারিচালিত রিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা নির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়াÑএসবও সড়ক দুর্ঘটনার অণ্যতম কারণ।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ক্ষমতার পালাবদল হলেও সড়কের নীতি পরিবর্তন না হওয়ায় সড়কে দুর্ঘটনা ও মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। যানজট ও চাঁদাবাজির বৃদ্ধির কারণে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের ভাড়া আরেক দফা বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সড়ক পরিবহন খাত সংস্কার না করায় দেশের মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি, সড়কের নিরাপত্তা ও ভাড়া নৈরাজ্য পরিবহন মালিকদের ইচ্ছের বন্দি দশা থেকে মুক্তি মেলেনি।
প্রিন্ট করুন





Discussion about this post