দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রতি বছর এ নিয়ে কত আলোচনা হয়, কিন্তু সমস্যা যে তিমিরে থাকে, সে তিমিরেই রয়ে যায়।
সদ্যবিদায়ী ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও হাজারো মানুষ। কয়েক দিন আগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন এবং আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ৮১২ জন।
এসব দুর্ঘটনার জন্য ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণ ও যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি, গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে এ সমস্যাগুলোর সমাধানের সুপারিশও করেছে।
মহাসড়কে কম গতির ছোট যানবাহন চলাচলেও দুর্ঘটনা ঘটে। ২০১৫ সালে একবার মহাসড়কে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। ওই বছর জাতীয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার, হিউম্যান হলার, নসিমন, করিমন ও ভটভটি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, কিন্তু আইনের প্রয়োগ হয় না। সরকারেরই কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের পক্ষ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয় না বললেই চলে। এখন মহাসড়কে এসব যানবাহন দেদার চলাচল করছে। মূলত এসব কারণেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরেছে না বলে সাধারণ মানুষের ধারণা।
দুর্ঘটনা কেন ঘটছে, নতুন করে কিছু বলার নেই। আমরা মনে করি, অংশীজনরা দায়িত্বশীল হলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণেই থাকত। প্রতি মাসেই কয়েকজন মানুষ মারা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। দেখা গেছে, দুর্ঘটনা সংঘটন করা গাড়িতে পেশাদার চালক ছিল না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নির্দেশনা দেওয়া হয়, কিন্তু মানা হয় না।
২০১৮ সালে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই শিক্ষার্থী মারা গিয়েছিল সড়ক দুর্ঘটনায়। এরপর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করে স্কুলশিক্ষার্থীরা। কিন্তু সড়কে দুর্ঘটনা আজও কমেনি। এর আগে মন্ত্রী, হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের পর সরকারপ্রধানের নির্দেশনার পরও সড়কে শৃঙ্খলা আজও ফেরেনি। শৃঙ্খলা না ফেরা অতীব দুঃখজনক।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ না জানা থাকলে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা যেত না। কিন্তু কারণ জেনেও রাষ্ট্র সড়ক দুর্ঘটনারোধে শূন্য সহনশীলতায় ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে গণপরিবহন নিরাপত্তা ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অঙ্গীকার থাকা দরকার।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ভাড়া নির্ধারণ ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিবহন শ্রমিকদের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ভুক্তভোগী ও যাত্রী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে নীতিমালার কার্যকারিতা থাকা দরকার। আমরাও তাই মনে করি।
