Print Date & Time : 25 April 2026 Saturday 2:46 am

সমন্বয়হীন প্রকল্পে বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি

আসাদুজ্জামান রাসেল, রাজশাহী: রাজশাহীতে নির্মাণাধীন শত শত কোটি টাকার ফ্লাইওভার প্রকল্পগুলো ঘিরে এবার সরব হয়েছেন প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষায়, শিল্পায়ন ও বাস্তব অর্থনৈতিক চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া এসব প্রকল্প ভবিষ্যতে ‘অব্যবহƒত সম্পদ’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছেÑউন্নয়ন দৃশ্যমান হলেও অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল, আর পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, শহরের কাজলা, মেহেরচন্ডী, তালাইমারী ও কোর্ট এলাকায় একাধিক ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ চলছে। এসব প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮০০ কোটিরও বেশি টাকা, যা বৃহত্তর অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ। নগরীর কাজলা থেকে মেহেরচণ্ডী পর্যন্ত নির্মিত ফ্লাইওভারটি বলতে গেলে অব্যবহƒত হয়ে পড়ে রয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘আমরা ভবিষ্যৎ ট্রাফিক চাপ বিবেচনায় রেখে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করছি। এখন হয়তো চাপ কম, কিন্তু ১০-১৫ বছর পর এর প্রয়োজনীয়তা বোঝা যাবে। তবে স্থানীয় মানুষদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা জানান, এগুলো রাজশাহীর দরকার ছিল না, আমাদের রেশম, চিনিকল আর পাটকলে এ বিনিয়োগ করলে অনেক ভালো হতো।’
তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। কাজলা-মেহেরচণ্ডী এলাকায় নির্মিত ফ্লাইওভারটির ব্যবহার সীমিত। অধিকাংশ যানবাহন এখনও নিচের সড়ক ব্যবহার করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ফ্লাইওভার আছে, কিন্তু গাড়ি কম ওঠে। আগের রাস্তা দিয়াই সবাই যায়। এই চিত্রকে উদ্বেগজনক বলছেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক অধ্যাপক জানান, যদি ট্রাফিক ডিমান্ড না থাকে, তাহলে এই ধরনের অবকাঠামো অব্যবহƒত হয়ে পড়ে। এতে বিনিয়োগের রিটার্ন
পাওয়া যায় না।
রাজশাহীর অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান এখনো সীমিত। বিসিক শিল্পনগরী-২ পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, নতুন বিনিয়োগও প্রত্যাশিত হারে আসছে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের এক অধ্যাপক জানান, ইনফ্রাস্ট্রাকচার তখনই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, যখন তা উৎপাদন ও বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। এখানে সেই সংযোগ স্পষ্ট নয়। তিনি আরও বলেন, ‘ফ্লাইওভারগুলো শিল্পাঞ্চল বা লজিস্টিক করিডরের সঙ্গে সংযুক্ত না হলে এগুলো অর্থনীতিতে গুণগত প্রভাব তৈরি করতে পারবে না।’
রাজশাহীর সাহেববাজার ও লক্ষ্মীপুর এলাকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রেতার সংখ্যা কমে গেছে। সাহেববাজারের ব্যবসায়ী মো. শাহীন আলী বলেন, আগে দিনে যত বিক্রি হতো, এখন তার অর্ধেকও হয় না। মানুষের হাতে টাকা নেই।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি ‘লোকাল ডিমান্ড ক্রাইসিস’-এর লক্ষণ, যা বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্মাণকাজে কিছু কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। শ্রমিক সুমন আলী বলেন, কাজ আছে এখন, কিন্তু প্রজেক্ট শেষ হলে কী করবো জানি না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পায়ন ছাড়া এই কর্মসংস্থান দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়। স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প অনেক সময় রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহƒত হয়। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ফ্লাইওভার একটি দৃশ্যমান উন্নয়ন। কিন্তু পরিকল্পনায় যদি অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা না করা হয়, তাহলে এটি ‘উন্নয়নের শ্বেতহস্তী প্রকল্প’ হয়ে যেতে পারে। এই প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন মূলত সরকারি তহবিল থেকে আসছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফ্লাইওভারগুলো শিল্পাঞ্চল, হাই-টেক পার্ক ও রপ্তানি কেন্দ্রের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত নয়। ফলে একটি ‘বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন মডেল’ তৈরি হয়েছে, যেখানে অবকাঠামো আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবাহ নেই।
রাজশাহী জেলা প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হচ্ছে। ভবিষ্যতে শিল্পায়ন বাড়লে এগুলোর গুরুত্ব আরও বাড়বে।
রাজশাহীর ফ্লাইওভার প্রকল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখেÑএটি কি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি, নাকি বর্তমানের একটি ব্যয়বহুল, সমন্বয়হীন উদ্যোগ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া এই উন্নয়ন ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে অবকাঠামো থাকে, কিন্তু অর্থনীতি এগোয় না।