তামান্না ইসলাম : শিক্ষা মানুষকে শুধু বই-পুস্তকের জ্ঞান দেয় না, দেয় একটা মানুষ হিসেবে দাঁড়ানোর শক্তি। বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষিত হওয়ার পর সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি যে দায়িত্ব থাকে—এই দায়বদ্ধতার জায়গাটা আমাদের কতটুকু দৃঢ়?
অনেকে মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হওয়া মানেই শিক্ষিত হয়ে যাওয়া। কিন্তু আসল শিক্ষা তো সেটা না। আসল শিক্ষা হলো মানুষকে বোঝা, সমাজকে বোঝা এবং নিজের অবস্থানটা বোঝা। দেশে দেখা যায়, অনেক উচ্চ ডিগ্রিধারী মানুষও রাস্তায় ময়লা ফেলে, লাইনে দাঁড়াতে পারে না এবং দুর্বলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এটা কি শিক্ষিত মানুষের লক্ষণ? আসলে শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়। শিক্ষা মানে হলো মানবিক হওয়া, দায়িত্বশীল হওয়া, সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা।
মানুষ যখন একটা ডিগ্রি নিয়ে বের হয়, তখন তার মধ্যে থাকে জ্ঞান, থাকে সুযোগ, থাকে ক্ষমতা। এই জ্ঞান, সুযোগ আর ক্ষমতা দিয়ে কী করা হচ্ছে, সেটাই আসল কথা।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষ আসলে সাধারণ পরিবার থেকে আসে। হয়তো বাবা-মা কষ্ট করে, অনেক স্বপ্ন নিয়ে ছেলেমেয়েকে পড়িয়েছেন। গ্রামের মানুষ চাঁদা তুলে স্কুল বানিয়েছে, সরকারি টাকায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় চলে। মানে শিক্ষার পেছনে শুধু বাবা-মা না, পুরো সমাজের একটা অবদান আছে।
তাহলে শিক্ষিত হয়ে দায়িত্ব কী শুধু নিজের জন্য? একটা চাকরি জোগাড় করা, ভালো বেতন পাওয়া, সংসার চালানো—এটা তো সবাই করে। শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব হলো সমাজকে কিছু ফেরত দেওয়া। এই ফেরত দেওয়ার বিষয়টি টাকা-পয়সা দিয়ে হতে হবে, এমন নয়। সৎভাবে চলা, মানুষের উপকার করা, সত্য কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো—এগুলোও সমাজকে ফেরত দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষিত মানুষের একটা বড় দায়িত্ব হলো সত্য কথা বলা। সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষিত মানুষরাই ক্ষমতাবানদের চাটুকারিতা করে, মিথ্যা কথা বলে, অন্যায়কে সমর্থন করে। কেন? চাকরির ভয়ে, লোভে এবং নিজের স্বার্থে। কিন্তু এটা তো শিক্ষিত মানুষের কাজ নয়।
যদি শিক্ষিত হয়ে অন্যায় দেখেও চুপ থাকা হয়, তাহলে শিক্ষার মানে কী? একজন শিক্ষিত মানুষ জানে, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। তার কাজ হলো সেটা মানুষকে বোঝানো, নিজে সঠিক পথে চলা। এতে ঝামেলা হতে পারে, কষ্ট হতে পারে; কিন্তু যদি শিক্ষিত মানুষই সাহস না দেখায়, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
শিক্ষিত মানুষের আরেকটা বড় দায়িত্ব হলো নিজের জ্ঞান অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। দেশে এখনও অনেক মানুষ অশিক্ষিত, অনেকে সুযোগ পায়নি। শিক্ষিত মানুষ হিসেবে কাজ হলো ওইসব মানুষকে সাহায্য করা।
এটা কিন্তু বড় কোনো কাজ করতে হবে, এমন নয়। বাসার কাজের মেয়েটাকে লেখাপড়া শেখানো যায়, পাড়ার গরিব ছেলেটাকে বিনা পয়সায় পড়ানো যায়, কারও অসুখ-বিসুখে পরামর্শ দেওয়া যায়। ছোট ছোট এই কাজগুলোই বড় পরিবর্তন আনে। যদি প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে একজন মানুষকেও শিক্ষিত করা যায়, সমাজ অনেক এগিয়ে যাবে।
শিক্ষিত মানুষদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নৈতিক থাকা। দেখা যায়, অনেক শিক্ষিত মানুষ ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে এবং মিথ্যা বলে। এটা তো লজ্জার কথা। যে মানুষ জানে, বোঝে, তার তো এসব করা উচিত নয়।
সমাজে এখন নৈতিকতার বড় সংকট। সবাই শর্টকাট খুঁজে, সহজে কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে। শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব হলো এই ধারা পাল্টানো। সৎভাবে চলা, কঠিন পথ বেছে নেওয়া, নীতি-নৈতিকতা মেনে চলা। এতে সময় লাগবে, কষ্ট হবে; কিন্তু এভাবেই তো সমাজ এগোয়।
শিক্ষিত মানুষদের পরিবেশ ও সমাজ সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। দেশে পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভাঙন—এসব বড় সমস্যা। শিক্ষিত মানুষ হিসেবে কি শুধু নিজের ঘর-গাড়ি নিয়ে ভাবা হবে, নাকি চারপাশের পরিবেশটাও দেখা হবে?
প্লাস্টিক কম ব্যবহার করা, গাছ লাগানো, বর্জ্য সঠিক জায়গায় ফেলা—এগুলো তো ছোট ছোট কাজ। কিন্তু শিক্ষিতরাই যদি এগুলো না করে, তাহলে অন্যরা কীভাবে শিখবে? উদাহরণ তৈরি করতে হবে। যাতে অন্যরা দেখে, শেখে।
তরুণ শিক্ষিতদের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ দেশের ভবিষ্যৎ তাদের হাতে। তারা যদি দায়িত্বশীল না হয়, তাহলে দেশ কোথায় যাবে?
তরুণদের উচিত সমাজের সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবা, সমাধান খোঁজা। শুধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে কাজ হবে না, মাঠে নামতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত হতে হবে, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। একজন তরুণ শিক্ষিত মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম থাকতে হবে, সমাজসেবার মানসিকতা থাকতে হবে।
দেশে এখনও অনেক নারী পিছিয়ে আছেন শিক্ষা থেকে। শিক্ষিত মানুষ হিসেবে দায়িত্ব হলো নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো। পরিবারে মেয়েদের পড়াশোনায় উৎসাহ দিতে হবে, সমাজে নারীদের এগিয়ে আসার পথ তৈরি করতে হবে। একজন শিক্ষিত নারী একটা পুরো পরিবারকে বদলে দিতে পারে। তাই নারী শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে সমাজে বিনিয়োগ। যদি সত্যিই শিক্ষিত হওয়া যায়, তাহলে এই বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে, কাজ করতে হবে।
দেশে দুর্নীতি একটা বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষিত মানুষ নিজেরাই দুর্নীতিতে জড়িত। কেউ ঘুষ দেয়, কেউ নেয়—এটা বন্ধ করতে হবে।
শিক্ষিত মানুষের উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া। নিজে দুর্নীতি না করা, অন্যকে দুর্নীতি করতে না দেওয়া। অনেকে বলে, একা একা কী করব? কিন্তু মনে রাখতে হবে, একের পর এক যুক্ত হলেই তো আন্দোলন হয়। একজন শুরু করলে, অন্যরা আসবে।
বাংলাদেশের একটা সমৃদ্ধ সংস্কৃতি আছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই বিপ্লব, গান, কবিতা, সাহিত্য—এসব গর্বের বিষয়। শিক্ষিত মানুষদের দায়িত্ব হলো এসব সংস্কৃতি ধরে রাখা, সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এখন পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে অনেকে নিজের শেকড় ভুলে যাচ্ছে। বাংলা ভাষাতেই ঠিকমতো কথা বলতে পারে না, অথচ ইংরেজিতে প্রগতিশীল সেজে কথা বলে। এটা তো ঠিক নয়। শিক্ষিত মানুষ হিসেবে নিজের ভাষা, নিজের সংস্কৃতি চর্চা করা উচিত, নতুন প্রজন্মকে শেখানো উচিত।
এখন প্রযুক্তির যুগ। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, মোবাইল—সবকিছুই হাতের মুঠোয়। শিক্ষিত মানুষদের দায়িত্ব হলো এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করা, অন্যদের শেখানো। ফেসবুকে গুজব ছড়ানো, মিথ্যা খবর শেয়ার করা, অন্যের ক্ষতি করা—এসব তো শিক্ষিত মানুষের কাজ নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে জ্ঞান বিতরণে, সমাজসেবায় এবং মানুষের উপকারে।
শিক্ষিত মানুষরা সাধারণত ভালো আয় করে। এই আয়ের একটা অংশ দিয়ে সমাজের দরিদ্র মানুষদের সাহায্য করা উচিত। জাকাত, সাদকা, দান—যেভাবেই হোক। আবার নিজের অর্থ সৎভাবে উপার্জন করা, ঠিকমতো ট্যাক্স দেওয়া—এগুলোও দায়িত্ব। অনেকে ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, কালোটাকা করে। এটা তো অন্যায়। শিক্ষিত মানুষের উচিত সততার সঙ্গে অর্থনৈতিক কাজকর্ম করা।
কোভিড মহামারিতে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য সচেতনতা কতটা জরুরি। শিক্ষিত মানুষদের উচিত নিজে স্বাস্থ্যসচেতন থাকা এবং অন্যদের সচেতন করা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, টিকা নেওয়া, রোগ প্রতিরোধ—এসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব। অনেক গ্রামে এখনও কুসংস্কার আছে, মানুষ ডাক্তারের কাছে যেতে চায় না। শিক্ষিত মানুষরাই পারে এই ধারা পাল্টাতে। শিক্ষা একটা সুযোগ, একটা ক্ষমতা। এই ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে ভালো কাজে, মানুষের উপকারে। শুধু নিজে ভালো থাকলেই হবে না, চারপাশের মানুষদেরও ভালো রাখার চেষ্টা করতে হবে। এটাই শিক্ষিত মানুষের আসল পরিচয়, এটাই দায়বদ্ধতা।
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন







Discussion about this post