Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 5:14 am

সম্পদমূল্যের অর্ধেকেরও নিচে দাম তবুও মিউচুয়াল ফান্ডে নেই ক্রেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা এখন চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে মেয়াদি (ক্লোজড-এন্ড) ফান্ডগুলোর ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, প্রকৃত সম্পদমূল্যের (এনএভি) অর্ধেক বা তারও কম দামে ইউনিট লেনদেন হলেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৭টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের সবকটির ইউনিটই এনএভির তুলনায় উল্লেখযোগ্য ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে। তবুও প্রায় প্রতিদিনই বিপুল বিক্রয় আদেশ থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী ক্রেতা মিলছে না, যা খাতটির গভীর সংকটকেই তুলে ধরছে।
বাংলাদেশ রেস ম্যানেজমেন্ট পিএলসি পরিচালিত একটি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড ‘পিএইচপি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড’। এই ফান্ডটির প্রতিটি ইউনিট এখন মাত্র ৩ টাকা ৪০ পয়সায় পাওয়া যাচ্ছে। অথচ বর্তমানে এর ইউনিটপ্রতি প্রকৃত সম্পদমূল্য (এনএভি) রয়েছে ৭ টাকা ৯ পয়সা। অর্থাৎ অর্ধেকেরও কম দামে এই ফান্ডের ইউনিট কেনার সুযোগ রয়েছে। একই ম্যানেজমেন্টে পরিচালিত ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডে ৬ টাকা ৪৮ পয়সা এনএভির বিপরীতে ইউনিট পাওয়া যাচ্ছে ৩ টাকা ৭০ পয়সায়। ৬ টাকা ৬৩ পয়সা এনএভির ইবিএল এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট বিক্রি হচ্ছে ৩ টাকারও নিচে।
বিভিন্ন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত এই সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি পরিচালিত ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের প্রতিটি ইউনিট পাওয়া যাচ্ছে ৩ টাকা ১০ পয়সায়। অথচ এর এনএভি রয়েছে ৬ টাকা ৮৩ পয়সা। একই ম্যানেজমেন্টের আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ৭ টাকা ৭১ পয়সা এনএভির বিপরীতে মাত্র ৩ টাকা ৮০ পয়সায় কেনা যাচ্ছে। সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিটির অধীনে পরিচালিত এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ৭ টাকা ৬১ পয়সা এনএভির বিপরীতে ৩ টাকা ৭০ পয়সায় কেনা যাচ্ছে।
এছাড়া তাদের ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডসহ অন্যান্য মেয়াদি ফান্ডগুলোর ইউনিটও অর্ধেক বা তার কম দামে পাওয়া যাচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পিএলসি কর্তৃক পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ইউনিটও প্রকৃত সম্পদমূল্যের অর্ধেক দামে কেনার সুযোগ রয়েছে। এই সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির অধীনে পরিচালিত প্রাইম ব্যাংক ফার্স্ট আইসিবি এএমসিএল মিউচুয়াল ফান্ড কেনা যাচ্ছে ৪ টাকার আশপাশে। অথচ এই ফান্ডের এনএভি রয়েছে ৮ টাকা। ৮ টাকা ৫৬ পয়সা এনএভির আইসিবি এএমসিএল সোনালী ব্যাংক লিমিটেড ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড কেনা যাচ্ছে মাত্র সাড়ে ৪ টাকায়।
আইসিবি পরিচালিত এই সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির অধীনে থাকা আইএফআইএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড-১ এর ইউনিট কেনা যাচ্ছে মাত্র ৩ টাকা ৯০ পয়সায়। অথচ এই ফান্ডের ইউনিটপ্রতি এনএভি রয়েছে ৭ টাকা ১৫ পয়সা। রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিটির অধিভুক্ত আইসিবি এএমসিএল থার্ড এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল ফার্স্ট অগ্রণী ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড এবং আইসিবি এএমসিএল সেকেন্ড মিউচুয়াল ফান্ডসহ অন্যান্য ফান্ডগুলোর ইউনিটও অর্ধেক বা তার কম দামে কেনার সুযোগ রয়েছে।
এদিকে এল আর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত এল আর গ্লোবাল বাংলাদেশ মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ানের ইউনিট কেনা যাচ্ছে ৩ টাকা ২০ পয়সায়। অথচ এই ফান্ডের প্রতি ইউনিটের বিপরীতে এনএভি রয়েছে ৮ টাকা ৬৩ পয়সা। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দামে কেনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই ফান্ডেও ক্রেতাসংকট দেখা গেছে। আজ মাত্র ১৫ জন ক্রেতা এই ফান্ডটির সাড়ে ৫ লাখ টাকার ইউনিট কিনেছেন।
শুধুমাত্র উল্লিখিত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর চিত্রই এমন নয়, বরং দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সব মিউচুয়াল ফান্ডই এখন অর্ধেক দামে কেনার সুযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মুহূর্তে মিউচুয়াল ফান্ডগুলো যতটা নিম্নদামে কেনা যাচ্ছে, এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ভবিষ্যতে ভালো সুযোগ বয়ে আনতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, প্রধানত বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের অভাব এবং আস্থাহীনতা, এই দুটি কারণে এত কম দাম হওয়া সত্ত্বেও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।
বাজারে ফান্ডগুলোর ইউনিটদর প্রকৃত সম্পদমূল্যের (এনএভি) কাছাকাছি হওয়া উচিত ছিল। এটি এনএভির সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ উপরে এবং সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ নিচে লেনদেন হওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৭টি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ‘বাংলাদেশ রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’ ও ‘আইসিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ১০টি করে মোট ২০টি ফান্ড। এর বাইরে ‘এল আর গ্লোবাল বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর ছয়টি, স্ট্র্যাটেজিক ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট-এর তিনটি, এইমস বাংলাদেশ, ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ও সিএপিএম ক্যাপিটাল অ্যান্ড অ্যাসেট পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট-এর দুটি করে মোট ছয়টি এবং ‘এশিয়ান টাইগার ক্যাপিটাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’ ও ‘ক্যাপিটেক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’-এর নিয়ন্ত্রণে একটি করে মোট দুটি ফান্ড রয়েছে।