Print Date & Time : 19 April 2026 Sunday 1:00 am

সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক : অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন ধাপে বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে পে-কমিশন। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এতে ১ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত।

গতকাল বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে পে-কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের পে-কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে নতুন এ প্রস্তাবনাটি তুলে ধরেন।

নতুন পে-কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান ২০ ধাপ বা গ্রেড অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। তবে প্রতিটি ধাপেই বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে নতুন এই প্রস্তাবনায়। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে বর্তমানে বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থাকলেও নতুন কাঠামোয় তা বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, প্রথম গ্রেডে বর্তমানে ৭৮ হাজার টাকা মূল বেতনের পরিবর্তে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হচ্ছে।

বেতন কমিশন সূত্র জানায়, প্রতিবেদন তৈরির সময় অনলাইনে পরিচালিত জরিপে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশগ্রহণ করেন। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তাÑএসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাদের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কমিশনের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিকভাবে নতুন কাঠামো কার্যকর হবে। পূর্ণমাত্রায় এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ আগামী বছরের ১ জুলাই থেকে। ভাতা কাঠামোতেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিদ্যমান ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এত দিন যারা এ ভাতা পাননি, তাদের জন্যও এটি আরও বিস্তৃতভাবে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।

বর্তমানে ১১তম থেকে ২০তম ধাপের কর্মচারীরা পরিবহন ভাতা পেলেও নতুন কাঠামোয় এটি ১০ম ধাপ পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের আরও বেশি কর্মচারী এই সুবিধার আওতায় আসবেন।

নতুন বেতন কমিশনের প্রস্তাবে পেনশনভোগীরাও উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাচ্ছেন। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যারা মাসে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশন পান, তাদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫ শতাংশ। আর ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য প্রস্তাবিত বৃদ্ধি ৫৫ শতাংশ।

৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনধারীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে বয়সভেদে এই ভাতা সর্বোচ্চ ৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ৫৫ বছরের কম বয়সী পেনশনভোগীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

বাড়ি ভাড়া ভাতার ক্ষেত্রে ধাপভিত্তিক ব্যবধান রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রথম থেকে দশম ধাপে বাড়ি ভাড়া তুলনামূলক কম হারে এবং ১১তম থেকে ২০তম ধাপে তুলনামূলক বেশি হারে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এতে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পাবেন বলে মনে করছে কমিশন।

প্রস্তাবিত পে-কমিশনের প্রতিবেদন হাতে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এটি একটি মস্ত বড় কাজ। মানুষ বহুদিন ধরে এর জন্য অপেক্ষা করছে। আউটলাইন দেখে বুঝলাম, খুবই সৃজনশীল কাজ হয়েছে।

প্রতিবেদন দাখিলকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নই এখন পরবর্তী কাজ। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হবে, যে কমিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।

প্রতিবেদনে নতুন ভাবে প্রস্তাব রাখা হয়েছেÑসরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, সার্ভিস কমিশন গঠন, বেতন গ্রেড ও স্কেলের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস, সরকারি দপ্তরসমূহে ভাতাসমূহ পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, কোনো কর্মচারীর প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে, বেতন কমিশন সংশ্লিষ্ট মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা প্রদানের সুপারিশ করেছে, শর্ত থাকে যে, সকল ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ দুজন সন্তান এই সুবিধা পাবে।

এতে আরও বলা হয়েছে, টিফিন ভাতার বর্তমানে প্রচলিত বিধানাবলি অব্যাহত থাকলে, তবে কমিশন ভাতার হার বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বর্তমানে প্রচলিত মাসিক টিফিন ভাতা ২০০ টাকার স্থলে ১ হাজার টাকা করা যেতে পারে।

প্রতিবেদন পেশকালে উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ কমিশনের সকল পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন সদস্যরা।

গত বছরের ২৭ জুলাই সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে এবং ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণ করে। ২০১৩ সালে অষ্টম বেতন কমিশন গঠনের পর দীর্ঘ ১২ বছর পর এই কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। কমিশন তাদের জন্য নির্ধারিত বাজেটের মাত্র ১৮ শতাংশ ব্যয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করে।

পে-কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য পৃথক পে-কমিশন গঠনের বিষয়টি সরকার চূড়ান্ত করবে বলে জানা গেছে।