চট্টগ্রাম ব্যুরো: নতুন গতি পেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ হিসেবে বিবেচিত বে টার্মিনাল প্রকল্প। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও সমীক্ষার পর এখন প্রকল্পটি বাস্তবের মাটিতে পা রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ডিজাইনের সিমুলেশন পরীক্ষার জন্য আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চার সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন। সেখানে টু-ডি সিমুলেশন সফলভাবে সম্পন্ন হলে দক্ষিণ আফ্রিকায় চূড়ান্ত থ্রি-ডি সিমুলেশন পরিচালনা করা হবে। প্রকল্প পরিচালক কমডোর মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে এই দলে রয়েছেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম, বন্দরের সহকারী হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোস্তাহিদুল ইসলাম এবং গাউসুল আজম রাসেল।
সিমুলেশন পরীক্ষার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে সহকারী হারবার মাস্টার গাউসুল আজম রাসেল বলেন, বে টার্মিনাল প্রকল্পটির যে ডিজাইন করা হয়েছে তা বাস্তবে ঠিকভাবে কাজ করবে কিনা সেটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিমুলেশন পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর চ্যানেল এবং টার্মিনাল এলাকায় জাহাজ চলাচল ও মুভমেন্ট, জাহাজ ঘোরানো প্রভৃতি বিষয়গুলো সফটওয়?্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারে দেখার নামই সিমুলেশন। এ পরীক্ষার মাধ্যমে বন্দর চ্যানেল ও টার্মিনাল এলাকায় জাহাজের চলাচল, ঘোরানোসহ বিভিন্ন অপারেশনাল বিষয় কম্পিউটার সফটওয়্যারে মডেল করে দেখা হবে। অর্থাৎ ভার্চুয়াল পরিবেশে পুরো বে টার্মিনাল নির্মাণ করে সেখানে জাহাজের মুভমেন্ট সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা যাচাই করা হবে। প্রথম ধাপে সিঙ্গাপুরে টু-ডি (দুই মাত্রিক) সিমুলেশন সম্পন্ন করা হবে। এ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সম্ভাব্য সময় হিসেবে ৩ বা ৪ মে নির্ধারণ করা হলেও চূড়ান্ত সময়সূচি ট্রেনিং আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
নগরের হালিশহর উপকূল থেকে দক্ষিণ কাট্টলীর রানি রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার উপকূলজুড়ে গড়ে উঠবে বে টার্মিনালÑ যাকে আগামী একশ বছরের বন্দর হিসেবে পরিকল্পনা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিদ্যমান বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণ সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বে টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পটিতে মোট তিনটি টার্মিনাল থাকবে। দুটি কনটেইনার টার্মিনালের একটি নির্মাণ করবে সিঙ্গাপুরের পিএসএ, অন্যটি দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডÑ উভয়ই জিটুজি চুক্তির আওতায়। তৃতীয় টার্মিনালটি হবে মাল্টিপারপাস, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাও রয়েছে।
বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি) নামের এই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্রেকওয়াটার নির্মাণে ৮ হাজার ২৬৯ কোটি ৮৫ লাখ, নেভিগেশন অ্যাকসেস চ্যানেলে ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ৪৫ লাখ, নেভিগেশন সহায়ক যন্ত্রপাতিতে ৫৭ কোটি ৭০ লাখ এবং রেল ও সড়ক সংযোগসহ অন্যান্য অবকাঠামোতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের সিংহভাগÑ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১০ হাজার ২৭২ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেবে বিশ্বব্যাংক। বাকি ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা আসবে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে। এছাড়া বে টার্মিনালের সঙ্গে রেল ও মহাসড়ক সংযোগ স্থাপনে আরও ১৯২ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। অর্থায়নের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করতে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের একটি পরিদর্শন দল প্রকল্পের খুঁটিনাটি ঘুরে দেখেছে। প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসালটেন্ট (এইচপিসি) সেলহর্ন এবং বাংলাদেশের কেএসের বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে অর্থনৈতিক পর্যালোচনার জন্য সম্প্রতি দুই দফা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদন পেয়েছে বেশ কয়েক মাস আগেই।
বছরব্যাপী সমীক্ষা শেষে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যে রিপোর্ট উপস্থাপন করেছে, তাতে সাগর ভরাট করে ভূমি উদ্ধারের মাধ্যমে স্ট্রাকচার ও সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই কাজের পাশাপাশি ব্রেকওয়াটার ও নেভিগেশন অ্যাকসেস চ্যানেল নির্মাণ, ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রমও পরিচালিত হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুনে নির্মাণকাজ শুরুর লক্ষ্য থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। তবে শীঘ্রই দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে বলে বন্দর কর্মকর্তারা আশাবাদী।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে বছরে ৩২ লাখ টিইইউএসের বেশি কন্টেনার হ্যান্ডলিং হয়। বে টার্মিনাল চালু হলে এই সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টিইইউএসে। তার চেয়েও বড় পরিবর্তন আসবে পরিচালন সুবিধায়। বিদ্যমান বন্দরে জাহাজ চলাচল নির্ভর করে জোয়ার-ভাটার ওপর, দিনে মাত্র চার ঘণ্টা নেভিগেশনের সুযোগ থাকে এবং দুটি বাঁক পেরিয়ে সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের মাঝারি আকৃতির জাহাজ ভেড়াতে হয়। বে টার্মিনালে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ১৩ মিটার ড্রাফটের বড় মাদার ভ্যাসেল অনায়াসে নোঙর করতে পারবে। বর্তমানে যেসব ছোট ফিডার জাহাজ ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরে কনটেইনার পরিবহন করে, বে টার্মিনাল চালু হলে চার-পাঁচটি ফিডারের পণ্য একটিমাত্র বড় জাহাজেই বহন করা সম্ভব হবে। ল্যান্ডলর্ড পদ্ধতিতে পরিচালিত হতে যাওয়া এই টার্মিনাল চালু হলে দীর্ঘদিনের গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাব অনেকটাই ঘুচে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Print Date & Time : 30 April 2026 Thursday 2:41 am
সিমুলেশন পরীক্ষায় সিঙ্গাপুর যাচ্ছে বিশেষজ্ঞ দল
শীর্ষ খবর ♦ প্রকাশ: