এফ আই মাসউদ : দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সুরক্ষায় কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল বা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বন্ড-সুবিধা প্রত্যাহারে গত ১২ জানুয়ারি এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করতে আশির দশক থেকে এ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান বরাবর এমন অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত হলে পোশাকশিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব ও গভীর সংকটের সৃষ্টি হবে।
গতকাল রোববার চিঠির সূত্রে জানা গেছে, এ বছরের ৬ জানুয়ারি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানি বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুতা উৎপাদন খাতকে রক্ষার জন্য ওই সুপারিশ সমর্থন করেছে। ভবিষ্যতে রপ্তানি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং স্থানীয় শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সংরক্ষণের স্বার্থে বাংলাদেশ কাস্টমস ট্যারিফের ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া আমদানি বিল অব এন্ট্রিতে বাণিজ্যিক বর্ণনায় কটন সুতার কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কাস্টম হাউসগুলোকে নির্দেশনা প্রদানের অনুরোধও করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা যায়, দেশে রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশ টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত থেকে আসে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ রপ্তানি আয় হয় নিট গার্মেন্টস খাত থেকে। রপ্তানি খাতকে উৎসাহিত করতে সরকার আশির দশক থেকে এ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে। নিট গার্মেন্টসের কাঁচামাল হিসেবে সুতা বন্ড সুবিধায় আমদানি হয়ে থাকে। তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তারা এ খাতে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে সুতা ও কাপড় উৎপাদনের অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন। এর ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থানীয় কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কটন সুতা ও ব্লেন্ডেড ইয়ার্ন সরবরাহে দেশের সামগ্রিক চাহিদা পূরণে সক্ষম।
সূত্র বলছে, দেশীয় সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিট গার্মেন্টসে কাঁচামাল হিসেবে সুতার বড় একটি অংশ জোগান দিতে সক্ষম। পাশের দেশে ৩০ কাউন্টের ১ কেজি সুতার ন্যূনতম মূল্য ২ দশমিক ৯৩ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশের উৎপাদিত সুতার উৎপাদন খরচের প্রায় কাছাকাছি। দেশের স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি সুতা বিক্রয় মূল্য ২ দশমিক ৮৫ মার্কিন ডলার বলে জানা গেছে। এদিকে সাম্প্রতিককালে পাশের দেশগুলো এ খাতে সহায়ক শিল্পনীতি যেমন কম দামে জমি প্রদান, বিক্রয়ের ওপর আয়কর অব্যাহতি, স্কিল ডেভেলপমেন্টে বিশেষ আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন গ্রহণ করায় তারা প্রায় ৩০ সেন্টের সমপরিমাণ সহায়তা পাচ্ছে। ফলে প্রতি কেজি সুতার উৎপাদন খরচের চেয়ে ৩০ থেকে ৩৮ সেন্ট কম দামে গড়ে ২ দশমিক ৫০ থেকে ২ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার মূল্যে বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানি করছে। অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করে সুতার উৎপাদন মূল্য কমিয়েও প্রতিযোগী দেশগুলোর প্রণোদনাপ্রাপ্ত মূল্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে এ খাতে দেশীয় উদ্যোক্তারা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন এবং তাদের বিনিয়োগ হুমকির মুখে পড়ছে।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত দুই অর্থবছরে বন্ড সুবিধায় সুতার আমদানি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার বিক্রয় হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া বর্তমানে সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে তাদের উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে। এর ফলে স্থানীয় সুতা উৎপাদনকারী শিল্প ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশীয় বৃহৎ প্রায় ৫০টি সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে। সুতা আমদানির এ ধারা অব্যাহত থাকলে অন্যান্য সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। ভবিষ্যতে নিট গার্মেন্টস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানিকৃত সুতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে; যা দেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হ্রাস, লিড টাইম বৃদ্ধি, মূল্য সংযোজন কমে যাওয়া এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করবে। এ কারণে জরুরি ভিত্তিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানি বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে মন্ত্রণালয়।
গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ও ২৯ ডিসেম্বর দুই দফা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানায় দেশের বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিটিটিসি একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন তৈরি করে; যা গত ৬ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এনবিআরকে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এ নিয়ে আজ জরুরি যৌথ সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের ফলে পোশাকশিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে ও গভীর সংকটের সৃষ্টি হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবেন সংবাদ সম্মেলনের আয়োজকরা।
এ বিষয়ে বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ও ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফজলে শামীম এহসান দৈনিক শেয়ার বিজকে বলেন, সুতা আমদানিতে শুল্কারোপ হলে পোশাক খাত ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়াবে। বিদেশি ক্রেতারা (বায়ার) আন্তর্জাতিক বাজার ধরে আমাদের সুতার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। তারা যদি কোনোভাবে সরকারকে পয়সা দিয়ে সুতা আনা বন্ধ করে দেয়, তাহলে তো আমরা প্রতিযোগিতায় টিকব না। তখন ক্রেতারা অন্য দেশমুখী হবে। ক্রেতারা যদি বলে এখানে দাম বেশি, কেন নেব?
তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট দেশ থেকে সুতা কিনতে হবেÑবিশ্বের কোথাও এটি অপরিহার্য নয়।
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post