সাধন সরকার : নতুন বছর শুরু হয়ে গেছে। নতুন বছর মানে নতুন হিসাব-নিকাশ, নতুন সম্ভাবনা। এক কথায় নতুন বছর, নতুন শপথ, নতুন প্রত্যাশা, নতুন পথচলা। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ যে মাত্রায় এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সেভাবে এগোতে পারেনি! বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশ একটু একটু করে আলোর পথে যাত্রা শুরু করে। সবার আগে শিক্ষার গুণগত মানের দিকে বেশি নজর দেওয়া দরকার রয়েছে বলে মনে করি। অন্যান্য খাত সংস্কারে যেমন কমিশন গঠিত হয়েছে তেমনি শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে শিক্ষা-শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য ভালো কিছুর আশায় সবাই।
কাগজে-কলমে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশ করেছে। দেশের প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের সামনে এখন দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। উন্নয়নের কোনো কোনো ক্ষেত্রে উদীয়মান বাংলাদেশ আজ পার্শ্ববর্তী পাকিস্তান ও ভারতের থেকে এগিয়ে! এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখার পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও সাফল্য অর্জনে জোর দিতে হবে। জুলাই গণঅভুত্থানের চেতনা জাগ্রত রাখতে হবে। সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে নবযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যেতে হবে।
মাতৃ ও শিশুমৃত্যু রোধে বেশি জোর দিতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিলে চলবে না। দেশের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। এই দুর্নীতি নির্মূলে জিরো টরালেন্স নীতি বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। মিডিয়া ও সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ যেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি, মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। যতই প্রবৃদ্ধি বাড়ছে ধনী-গরিব আয় বৈষম্য ততই বাড়ছে! এক্ষেত্রে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসনে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সব ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একটা গোষ্ঠী সবসময় মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে বাজার থেকে ফায়দা লুটের চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে। এদের কারণে জনসাধারণের বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। তাই কালোবাজারি ও মজুদদারীদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলমান রাখতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীকে সব ধরনের মাদক থেকে দূরে থাকতে হবে। শ্রমের ন্যায্যমূল্য যাতে নিশ্চিতকরণে গুরুত্বারোপ করতে হবে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় আরও গুরুত্বারোপ করতে হবে। জুলাই গণঅভুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন সোনার বাংলা গড়া। মানবিক মূল্যবোধপূর্ণ সমাজ গঠনে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সঙ্গে নিয়ে সমাধানে জোর দিতে হবে।
দুঃখের কথা, পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম সারির দেশগুলোর একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ভুগছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের জীবন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তাই ‘প্যারিস চুক্তি’ মেনে উন্নত দেশের সাহায্য-সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় চলমান সব প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শহরগুলোতে সব ধরনের দূষণ মারাত্মক আকার করেছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, বর্জ্য দূষণ, পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে আধুনিক ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের নদ-নদীর দখল ও দূষণ রোধ করতে হবে। রাজধানী ঢাকার পরিবেশ রক্ষার দিকে বেশি নজর দিতে হবে। দেশের প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, পরিবেশ রক্ষা হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ওপর ঝুঁকিও কমবে। এ ছাড়া প্রকৃতি-পরিবেশ রক্ষাসহ পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা গেলে গড় আয়ু আরও বাড়বে এবং উন্নয়ন টেকসই হবে।
শেষমেষ রাজনীতি যেহেতু সবকিছুকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সেহেতু রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল সবার আগে জরুরি। রাজনীতি হতে হবে জনকল্যাণমূলক। নতুন বছর ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। রাজনীতির মাঠে সহিংসতা, হানাহানি কেউ দেখতে চাই না। নির্বাচন হোক সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি যত স্থিতিশীল হবে বাংলাদেশের উন্নয়ন তত ত্বরান্বিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে সর্বস্তরে গণতন্ত্র ও কল্যাণকর রাজনীতি কাম্য। রাজনীতিবিদদের নীতির প্রশ্নে আপোসহীন থাকতে হবে। দেশের স্বার্থে, উন্নয়নের স্বার্থে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও পরস্পরের ওপর কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করতে হবে। রাজনীতির ক্ষেত্রে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা প্রদর্শন ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে। প্রায় সবসময় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ওপর নানা ধরনের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠে! এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দল ও জোটকে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সবাই যেন গণতান্ত্রিক শর্তগুলো অবাধে উপভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। ধারণা করা যায়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে প্রবেশ করতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না! উন্নয়ন অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হবে। তথ্য মতে, দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ। বাস্তবিক পক্ষে বেকারের সংখ্যা আরও বেশি! কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি হলে উন্নয়ন টেকসই হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে ! আসন্ন নির্বাচনে তরুণদের কাজে লাগাতে ও তাদের কর্মসংস্থানে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে সব বাধা দূর করার পাশাপাশি প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। এ ছাড়া প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার পথ সুগম করতে হবে। চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের আবেদন ‘ফি’ উঠিয়ে দিতে হবে। তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যেককে তাদের মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে লাগাতে পারলে দেশটা বদলে যেতে বেশি সময় লাগবে না। নতুন বছরে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশা আমাদের সবার।
শিক্ষক, জলবায়ু ও পরিবেশকর্মী
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post