নিজস্ব প্রতিবেদক : সফলতার বিভিন্ন সূচকে অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করার পর ২০২৬ সাল থেকে সোনালী ব্যাংকে আর প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি থাকবে না বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিলে সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শওকত আলী খান। এ সময় ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় সভায় সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান বলেন, ২০২৪ সালে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল পাঁচ হাজার ৬৯৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ব্যাংকের জন্য বড় অর্জন। প্রভিশন সংরক্ষণের পরও নেট মুনাফা প্রায় এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ব্যাংকগুলোর একটি বড় সমস্যা ছিল মূলধন ঘাটতি। তবে চলতি বছর থেকে সোনালী ব্যাংকের আর কোনো মূলধন ঘাটতি নেই। এ অপবাদ থেকে মুক্ত হওয়াটা আমাদের জন্য বিশাল অর্জন।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২৫ ডিসেম্বর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার (সিএল পারসেন্টেজ) ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। আগামী ২০২৬ সালে এটি ১১-১২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার তিন বছরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের ক্যাপিটাল রিস্ক ওয়েটেড রেশিও ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ১০ শতাংশের চেয়েও বেশি রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ব্যাংকের ব্যবসা সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
এমডি আরও উল্লেখ করেন, সরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সোনালী ব্যাংকের এখনো উল্লেখযোগ্য পাওনা রয়েছে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে এককভাবে এলসি কার্যক্রম পরিচালনার বিপরীতে ব্যাংকের প্রায় পাঁচ হাজার ৫০০ কোটি টাকার এলসি কমিশন এখনো বাকি রয়েছে। এই অর্থ আদায় হলে ব্যাংকের মূলধন আরও শক্তিশালী হবে।
ঋণ কনসেন্ট্রেশন বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট শাখায় অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ বন্ধ রাখা হয়েছে। বর্তমানে পাঁচটি শাখায় ঋণের কনসেন্ট্রেশন ৩৭ শতাংশ, যা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হচ্ছে। বড় ঋণ অন্য শাখাগুলোয় স্থানান্তরের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খেলাপি ঋণ আদায়ের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি জানান, শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছ থেকে ইতোমধ্যে ৭৪৫ কোটি টাকা আদায় হয়েছে এবং বাকি অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আমানত প্রসঙ্গে শওকত আলী খান বলেন, সোনালী ব্যাংকের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এখনো দৃঢ়। এজন্য ব্যাংকে আমানতের প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ে সতর্কতা অবলম্বন করায় আমানত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঋণ বিতরণ সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, হলমার্ক কেলেঙ্কারির পর সোনালী ব্যাংকে এ ধরনের বড় কোনো অনিয়ম ঘটেনি। কঠোর ঋণ যাচাই ও সুশাসনের কারণে খেলাপি ঋণের হারও কমছে।
আগামী ২০২৬ সালের জন্য নতুন ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা খুব শিগগির ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন বছরে ব্যাংকের আয় ২০২৫ সালের তুলনায় আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ৪১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৭ কোটি টাকা। নিরীক্ষা শেষে নিট মুনাফা ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করছেন শওকত আলী।
বিদায়ী বছর শেষে খেলাপির হার ১৬ শতাংশে নেমেছে বলে জানিয়ে সোনালী ব্যাংকের এমডি বলছেন, আগামী বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার এক অঙ্কে অর্র্থাৎ ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের ঋণ স্থিতি ছিল এক লাখ চার হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আমানতের স্থিতি ছিল এক লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।
মোট আমানতের মধ্যে অর্ধেকের বেশি স্বল্প সুদের বলে জানান শওকত আলী। তিনি বলেন, ‘আস্থার কারণে সোনালী ব্যাংকের আমানত এখনো বাড়ছে। আগামী বছরে ঋণের অঙ্কও বাড়বে।’
এছাড়া ২০২৬ থেকে ২৭ সালের মধ্যে ব্যাংকের খেলাপি সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসা হবে বলেও জানান সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ২০২৫ সালে পরিচালন মুনাফায় সর্বোচ্চ রেকর্ড অর্জন করেছে। সদ্য সমাপ্ত বছরে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে আট হাজার ১৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা আগের বছর ২০২৪ সালের তুলনায় দুই হাজার ৩২২ কোটি ৮০ লাখ টাকা বেশি।
