আনোয়ারুল ইসলাম : আফ্রিকা মহাদেশের হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দেন, পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ড আব্রাহাম চুক্তির চেতনার আলোকে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র সই করেছে। ভিডিও কলে সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরাহমান মোহামেদ আবদুল্লাহিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কাছ থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল সোমালিল্যান্ড। তবে এ ভূখণ্ড এত বছরের জাতিসংঘের কোনো সদস্য দেশের কাছ থেকে স্বীকৃতি পায়নি। ইসরায়েল কর্তৃক স্বীকৃতি ঘোষণার নিন্দা জানিয়েছে সোমালিয়া সরকার। তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরায়েল কর্তৃক এহেন কর্মকাণ্ড সোমালিয়ার ‘সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ’ ও ‘বেআইনি’ পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দীর্ঘকাল ধরে উপেক্ষিত থাকা একটি অঞ্চল সোমালিল্যান্ডকে ঘিরে সম্প্রতি ইসরায়েলের যে কূটনৈতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিষয় নয়, বরং এটি লোহিত সাগর থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইসরায়েল কর্তৃক সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি প্রদানের এই সিদ্ধান্তটি মূলত একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং সুদূরপ্রসারী কৌশলগত কূটনীতির অংশ।
সোমালিল্যান্ডের পরিচিতি ও এর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি সোমালিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি ভূখণ্ড যা আদতে ব্রিটিশ সোমালিল্যান্ড হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৮৮৪ সাল থেকে এটি ব্রিটিশদের শাসনাধীন থাকলেও ১৯৬০ সালের ২৬ জুন এটি স্বাধীনতা লাভ করে এবং দ্রুতই এটি দক্ষিণ দিকের ইতালীয় সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হয়ে বর্তমানের সোমালিয়া রাষ্ট্র গঠন করে। কিন্তু এই একীভূতকরণ সোমালিল্যান্ডের মানুষের জন্য কাক্সিক্ষত মুক্তি বয়ে আনেনি। সত্তরের দশকের শেষেরদিকে এবং আশির দশকের শুরুতে সিয়াদ বাররে-র নেতৃত্বাধীন সোমালি সরকারের চরম দমন-পীড়ন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোমালিল্যান্ডে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। এই অসন্তোষেরই চূড়ান্ত বহির্প্রকাশ ঘটে ১৯৮১ সালে লন্ডন ও আদ্দিস আবাবায় সোমালি ন্যাশনাল মুভমেন্ট বা এসএনএম গঠনের মধ্য দিয়ে। ইসহাক গোত্রের নেতৃত্বের এই স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীটি সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৮ সালে ও বুরাও শহরে সিয়াদ বাররের সরকারি বাহিনী যে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছিল, তাকে সোমালিল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় ৫০ হাজার নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা সোমালিল্যান্ডের মানুষের মনে চূড়ান্ত স্বাধীনতার বীজ বপন করে দেয়। ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে সিয়াদ বাররের পতনের পর উত্তর দিকের এই অংশটি নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে।
গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে তারা একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সরকার, নিজস্ব মুদ্রা, পাসপোর্ট এবং সেনাবাহিনী পরিচালনা করলেও আন্তর্জাতিকভাবে তারা কোনো রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি।
?এই দীর্ঘ অপেক্ষার পর ইসরায়েলের মতো একটি প্রভাবশালী মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির পক্ষ থেকে সোমালিল্যান্ডের প্রতি স্বীকৃতির বার্তা আসাটি মূলত বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট নিদর্শন। ইসরায়েল কেন হঠাৎ সোমালিল্যান্ডকে এই স্বীকৃতি প্রদানের পথে হাঁটছে, তার পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কৌশলগত ও নিরাপত্তাজনিত কারণ।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রনীতির একটি প্রধান লক্ষ্য হলো লোহিত সাগরে নিজের স্থায়ী প্রভাব এবং নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে সোমালিল্যান্ড হর্ন অব আফ্রিকার এমন একটি স্থানে অবস্থিত যেখান থেকে সরাসরি বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর কড়া নজরদারি করা সম্ভব। এই প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ যা লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ, বিশেষ করে জ্বালানি তেল এবং পণ্যবাহী জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করে।
ইসরায়েলের জন্য এই জলপথটি তাদের আইলাত বন্দরের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকার একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে হুতি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায়শই বিঘ্নিত হচ্ছে। এমন অবস্থায় সোমালিল্যান্ডের বারবেরা বন্দর এবং এর উপকূলরেখায় একটি মিত্রশক্তি থাকা ইসরায়েলের জন্য কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং সামরিক এবং গোয়েন্দা নজরদারির জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ইসরায়েল মনে করছে, এই এলাকায় একটি কৌশলগত অবস্থান পেলে তাদের নৌ-নিরাপত্তা সুসংহত হবে এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে লোহিত সাগরে যে কোনো প্রতিকূল শক্তিকে মোকাবিলা করা সহজ হবে। সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েল মূলত এই অঞ্চলে একটি শক্তপোক্ত গোয়েন্দা ও নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চাইছে যা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
?ইসরায়েলের এই পদক্ষেপের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক প্রভাব বলয়ের প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তুরস্ক, মিসর এবং সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরেই হর্ন অব আফ্রিকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তুরস্ক গত এক দশকে সোমালিয়ায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে এবং মোগাদিশুতে তাদের সবচেয়ে বড় বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। অন্যদিকে মিসর সবসময়ই লোহিত সাগর এবং সুয়েজ খালকে তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং এই জলপথে অন্য কোনো শক্তির উত্থানকে সন্দেহের চোখে দেখে। সৌদি আরবও তার ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা এবং এর পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর ওপর প্রভাব বজায় রাখতে অত্যন্ত আগ্রহী। এই তিনটি শক্তির নিজস্ব কৌশলগত অবস্থানের বিপরীতে ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি প্রদান এবং তাদের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে ইসরায়েল পরোক্ষভাবে তুরস্ক এবং মিসরের প্রভাব বলয়কে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিশেষ করে নীল নদের পানি বণ্টন নিয়ে ইথিওপিয়া ও মিসরের যে টানাপোড়েন রয়েছে, সেখানে সোমালিল্যান্ড ও ইথিওপিয়ার বর্তমান সখ্যতা এবং ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তি মিসরের জন্য এক নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে এই শক্তিগুলোর প্রভাব বলয়ের ঠিক কেন্দ্রস্থলে একটি নতুন কৌশলগত উপস্থিতি তৈরি করছে, যা মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার রাজনীতির মেরুকরণে এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
?ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ডের এই নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর একটি বিশাল সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। প্রথমত, সোমালিল্যান্ডের জন্য এটি হবে আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়ার একটি মহাদ্বার। ইসরায়েলের স্বীকৃতির পর পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর পক্ষ থেকে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। এটি আফ্রিকার ইউনিয়ন বা এইউ-এর ভেতরেও একটি বিতর্ক তৈরি করবে যা দীর্ঘদিনের ‘অপরিবর্তিত সীমানা’ নীতির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। দ্বিতীয়ত, এর ফলে এই অঞ্চলে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের তৎপরতা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী এলাকায় গোয়েন্দা স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে ইসরায়েল কেবল হুতি বা ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকেই নয়, বরং সমগ্র আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের সামরিক গতিবিধির ওপর নজর রাখতে পারবে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বারবেরা বন্দরের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ইথিওপিয়া ইতোমধ্যে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে লোহিত সাগরে প্রবেশের সুযোগ পেতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। ইসরায়েল যদি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়, তবে বারবেরা বন্দরটি একটি বৈশ্বিক হাব বা কেন্দ্রে পরিণত হবে যা দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরের বিকল্প হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে। চতুর্থত, এই স্বীকৃতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের এক নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হবে। কাতার ও তুরস্ক যেখানে সোমালিয়ার মূল সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে, সেখানে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সোমালিল্যান্ডের পক্ষ নেওয়ায় একটি ছায়া কূটনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
?ভবিষ্যতে এই ঘটনাপ্রবাহ লোহিত সাগরের নিরাপত্তা কাঠামোকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। ইসরায়েলের এই কৌশলগত পদক্ষেপে অনেক মুসলিম প্রধান দেশ সোমালিল্যান্ডের ওপর অসন্তুষ্ট হতে পারে, কিন্তু সোমালিল্যান্ডের জন্য তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং উন্নয়নের জন্য এই স্বীকৃতি ছিল অপরিহার্য। ইসরায়েল এখানে কেবল একজন কূটনৈতিক বন্ধু হিসেবে নয়, বরং একজন নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এর ফলে সোমালিল্যান্ডের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং তারা সোমালিয়ার সম্ভাব্য যে কোনো আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে আরও আত্মবিশ্বাসী হবে। অন্যদিকে, ইসরায়েল এই অঞ্চলের মাধ্যমে আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করবে। পরিশেষে বলা যায়, ইসরায়েল কর্তৃক সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতির এই ঘটনাটি কেবল একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি বৃহৎ দাবার চাল। লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, আগামীদিনের বিশ্ব বাণিজ্যের নাটাইও মূলত তার হাতেই থাকবে। ইসরায়েল সেই নাটাই নিজের হাতে রাখতে সোমালিল্যান্ডকে একটি গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। এই কৌশলগত কূটনীতি যদি সফল হয়, তবে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলটি কেবল সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু না হয়ে বৈশ্বিক রাজনীতির এক নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হবে। সোমালিল্যান্ডের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস এবং ইসরায়েলের কঠোর বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি মিলেমিশে এক নতুন ভূ-রাজনীতির জন্ম দিচ্ছে, যার প্রভাব আগামী কয়েক দশক ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে অনুভূত হবে।
শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন






Discussion about this post