আনোয়ার হোসাইন সোহেল : স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এক পরিচালকের বাসায় ফাঁকা গুলি ও হুমকিমূলক চিরকুট পাওয়ার ঘটনায় ব্যাংকটির গতকাল বৃহস্পতিবারের পর্ষদ সভা স্থগিত করা হয়েছে। এর আগের দিন বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে এ ঘটনার পর ব্যাংক খাতে নিরাপত্তা ও পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকালে ধানমন্ডি থানার ৯/এ রোডের ২৩ নম্বর বাসায় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেডের বোর্ড ডিরেক্টর অশোক কুমার সাহার বাসায় দুর্বৃত্তরা ফাঁকা গুলি ছোড়ে। একই সঙ্গে বাসায় একটি হুমকিমূলক চিরকুট রেখে আগামী ২৫ তারিখ অনুষ্ঠিতব্য ব্যাংকের বোর্ড সভায় অংশ না নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
চিরকুটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, সভায় অংশ নিলে জীবননাশসহ দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি রয়েছে। ঘটনার সময় অশোক কুমার সাহা চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। বর্তমানে ওই বাসায় তার মেয়ে ও শ্যালক বসবাস করেন।
রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম বুধবার দিবাগত রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তিনটি মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন যুবক বাসার সামনে আসে। পরে তাদের মধ্যে তিনজন বাসায় ঢুকে অশোক কুমার সাহাকে খোঁজাখুঁজি করে এবং নিরাপত্তাকর্মীকে জানায়, তিনি যেন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পর্ষদ সভায় অংশ না নেন। এরপর একটি চিরকুট রেখে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পুলিশ জানায়, দুর্বৃত্তরা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে বাসার সিসিটিভি ক্যামেরার রেকর্ডিং ডিভাইস খুলে নিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ডিসি মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘২৫ তারিখ ব্যাংকের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ষদ সভা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাংককেন্দ্রিক কোনো স্বার্থান্বেষী পক্ষ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।’
এদিকে পর্ষদ সভা স্থগিতের বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মুখপাত্র সোহেল রহমানী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে সভায় উপস্থিত হতে না পারায় বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।’
এ ঘটনায় গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, পরিচালকদের একাংশ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাবিবুর রহমানের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছেন।
অন্যদিকে গত ২০ জানুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টায় জুলাই আন্দোলনের মিথ্যা মামলায় আরেক পরিচালক মোহাম্মদ জাহেদুল হককে ডিবি দিয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন তার পরিবার। ভুক্তভোগীর ছেলের সঙ্গে কথা বললে তিনি বোর্ড মিটিংয়ের আগ মুহূর্তে তার বাবার এই ডিবি দিয়ে তুলে নেওয়া ও মামলায় আটক দেখানোর জন্য ব্যাংকের এমডি হাবিবুর রহমানকে সরাসরি দায়ী করেন।
এদিকে আরেক স্বতন্ত্র পরিচালক বর্ষীয়ান ব্যাংকার গোলাম হাফিজ আহমেদকে পরিচালক পদ থেকে অপসারণ এবং বোর্ড মিটিংয়ে না আসার জন্য সম্পূর্ণ অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূতভাবে চিঠি দিয়েছেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ। নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি তাকে কোনো এজেন্ডা বা বোর্ড মিটিংয়ের নোটিশও পাঠানো হয়নি, যাতে তিনি মিটিংয়ে অনুপস্থিত থাকেন এবং হাবিবুরের বিপক্ষে অবস্থান না নিতে পারেন। এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহমেদকে অভিযোগ দিলে তিনি জানান, ‘চেয়ারম্যানের কোনো এখতিয়ারই নেই এমন চিঠি দেওয়ার এবং বিষয়টি তিনি তাৎক্ষণিক খতিয়ে দেখার কথা বলেন।’
উল্লেখ্য, বিভিন্ন ব্যাংকিং অনিয়ম, দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্টতা এবং যোগসাজশে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের (বিআরপিডি) ডিভিশন-২-এর পরিচালক মো. আলাউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ব্যাখ্যা তলব করা হয় এবং জবাবের জন্য সাত কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়। একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এমনকি এমডি হয়েও দুদকের মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি (বর্তমানে জামিনে) হাবিবুর রহমানের কাছে পত্রের (সূত্র নং-বিআরপিডি (বিএমএমএ)/৬১৫/২৮/২০২৫-১৬৭১৪) বরাতে অনিয়মের বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ৩০ অক্টোবর ব্যাংকের ১১ সদস্যের বোর্ড মিটিংয়ে ছয় পরিচালক হাবিবুরকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া হাইকোর্টের বিধিনিষেধ অমান্য করে ৭ জানুয়ারির বোর্ডের প্রতিপক্ষ পরিচালকদের অনুপস্থিতিতে সাত পরিচালকের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পুর্ননিয়োগের প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। গত ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক চেয়ারম্যানকে সুপার মেজরিটির ভিত্তিতে এমডির পুনর্নিয়োগের বিষয়টি অনুমোদনের নির্দেশনা দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, নিজস্ব প্রভাব, ভয়ভীতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু অসাধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সহায়তায় সুকৌশলে আপন জুয়েলার্সের পাঁচ মণের বেশি স্বর্ণ চোরাচালান মামলার আসামি গুলজার আহমেদ (বর্তমানে জামিনে) এবং ঋণখেলাপি মঞ্জুর আলমের ঋণ শেষ মুহূর্তে এসে পুনঃতফসিল করে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দুজনের এনওসি এনে পরিচালনা পর্ষদে তড়িঘড়ি করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তেমনি তার পুনর্নিয়োগের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী পরিচালকদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও পরিচালনা পদ কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতায় হাবিবুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা তলব করলেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকই তাদের নিজেদের করা বিআরপিডি সার্কুলার ৫ লঙ্ঘন করেছে।
গত ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডেটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স ডিপার্টমেন্ট থেকে এ-সংক্রান্ত এক চিঠি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পর্ষদে পর্যবেক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম ডিপার্টমেন্টের পরিচালক মো. শরাফত উল্লাহ খানকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, শরাফত উল্লাহ খান স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ, নির্বাহী কমিটি ও অডিট কমিটির সব সভায় উপস্থিত থাকবেন এবং সভায় আলোচনার বিষয়াদির ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ হয়ে তার মতামত ও বক্তব্য পেশ করবেন। এই নিয়োগ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এখন থেকে অনুষ্ঠেয় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ, নির্বাহী কমিটি ও অডিট কমিটির সব সভার আলোচ্যসূচি, স্মারক ইত্যাদি পরিচালক শরাফত উল্লাহ খানের কাছে সভা অনুষ্ঠানের নির্ধারিত তারিখের অন্তত তিন কার্যদিবস আগে পাঠানোসহ তাকে প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতা প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে এই পত্র প্রেরণ করা হলো বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন এসডিএডির পরিচালক মো. আবদুল মান্নান।
অভিযোগ রয়েছে, হাবিবুর রহমান ইউনিয়ন ব্যাংকে কর্মরত থাকাকালে এস আলম গ্রুপের অনুকূলে ২ হাজার ৬০৭ কোটি টাকার অনিয়মিত ঋণ অনুমোদনে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগ-৭-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রিত প্রায় ৩০টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ২৩ কোটি টাকা থেকে ১৪৮ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ অনুমোদন করা হয়। এসব ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। বর্তমানে এসব ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই অস্তিত্ববিহীন।
জানা গেছে, হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক মামলা রয়েছে। ২০০০ সালে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ক্রেডিট বিভাগে দায়িত্বে থাকাকালে তিনি প্যাট্রিক ফ্যাশনস নামের এক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ গোপন করে নতুনভাবে আট কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের জন্য মিথ্যা তথ্য দেনÑএমন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, যোগসাজশ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা হয় (মামলা নং ২৭২/২২)।
