নিজস্ব প্রতিবেদক : স্পিকারের শূন্য আসন নিয়ে অধিবেশন শুরু, প্ল্যাকার্ড দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদ এবং ভাষণ শুরুর পরপরই বিরোধীদলীয় সদস্যদের ওয়াক আউট-এসব নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরু হলো বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের প্রায় ১৯ মাস পর যাত্রা করল বাংলাদেশে নতুন সংসদ। এবার ব্যতিক্রম পরিস্থিতিতে সংসদ অধিবেশন শুরুর প্রক্রিয়া, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণে থাকা বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনার জš§ দিয়েছে।
এদিন নিয়ম অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দিতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে আহ্বান জানান নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সে সময় সংসদে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ শুরু করেন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সংসদ সদস্যরা।
সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষায় স্পিকার বারবার আহ্বান জানালেও প্রতিবাদ চালিয়ে যান বিরোধী দলের এমপিরা।
তাদের প্রতিবাদের মধ্যেই নিজের ভাষণ চালিয়ে যান রাষ্ট্রপতি। বক্তব্যের একপর্যায়ে নানা সেøাগান দিয়ে অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য চলাকালে এর সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়াতে দেখা যায়। বিরোধী দলের ওয়াক আউট ছাড়াও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রথম অধিবেশনের শুরুর দিনটি ছিল ঘটনাবহুল। সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এবার এর ব্যতিক্রম হয়েছে।
আগের সংসদের স্পিকারের পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় এদিন স্পিকারের আসন ফাঁকা রেখেই শুরু হয় সংসদ অধিবেশন। পরে একজন সভাপতির মাধ্যমে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়।
প্রথম অধিবেশন শুরুতে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। এসময় স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, দলের প্রতিনিধিত্ব করলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমার রাজনীতি দেশ ও জনগণের স্বার্থের রাজনীতি। জাতীয় সংসদকে সব যুক্তি, তর্ক ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না ও হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আবারও জনগণের ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের রাজনীতির এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছেন, যার অশেষ রহমতে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন যাত্রা শুরু করা সম্ভব হয়েছে।
হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির বক্তব্য: বেলা সাড়ে ৩টায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ভাষণ শুরু করার আমন্ত্রণ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিসহ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এর বিরোধিতা করে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে যান। এসব প্ল্যাকার্ডে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা ছিল‘জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে গাদ্দারি জনগণ সইবে না।’ তীব্র প্রতিবাদের মুখেই এ সময় স্পিকার সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আহ্বান জানান সংসদ সদস্যদের। এ সময় প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি।
স্পিকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ করলে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা আবারও চিৎকার করতে থাকেন, দাঁড়িয়ে পড়েন। স্পিকার বারবার রাষ্ট্রপতির ভাষণ শোনার অনুরোধ করেন, একপর্যায়ে ভাষণও শুরু করেন রাষ্ট্রপতি। বিরোধী দলের হট্টগোলের মধ্যেই নিজের বক্তব্য চালিয়ে যান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। একপর্যায়ে সংসদ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
প্রসঙ্গত, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল। সে কারণে সংসদে তার ভাষণের বিরোধিতা করার কথা বলা হয়েছে জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে।
সংসদে নিজের বক্তব্যে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের পরিকল্পনা, জুলাই আন্দোলনে সাবেক সরকারের ভূমিকা, স্বাধীনতার ঘোষক, দুর্নীতিসহ নানা বিষয়ে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালে ক্ষমতা ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
তিনি বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪’ প্রণয়ন করা হয়, যার ফলে বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়, তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার হিসেবে স্বীকৃতি পায়, বলেও উল্লেখ করেন সাহাবুদ্দিন।
ঘটনাবহুল অধিবেশনের প্রথম দিন: সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এবার এর ব্যতিক্রম হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করার পর তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। আর হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে।
এমন পরিস্থিতিতে সংসদ কক্ষে স্পিকারের আসনটি ফাঁকা রেখেই শুরু হয় অধিবেশন। পরে সংসদের সম্মতিতে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
তার সভাপতিত্বে স্পিকার হিসেবে বিএনপি নেতা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচন করা হয় ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে।
পরে সংসদের অধিবেশন ৩০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান এর উপস্থিতিতে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বিরতির পর স্পিকার হিসেবে নিজের প্রথম অধিবেশনের বক্তব্যে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হবে জাতীয় সংসদ।
এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পিকারকে বলেন, আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নয়। আপনারা এই সংসদের স্পিকার। এরপর বক্তব্য দেন বিরোধী দলের প্রধান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
স্পিকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনি ইতোমধ্যে বিএনপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আপনি সকলের। আমরা মনে করি, আপনার কাছে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাদা কিছু হবে না।
তবে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এর আগে সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, স্পিকার নির্বাচনের বিষয়ে আগে থেকে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। ভবিষ্যতে যেসব বিষয়ে আলোচনা সম্ভব সেসব বিষয়ে যেন তাদের সঙ্গে আলাপ করা হয়-এটা তারা আশা করবেন।
এদিন সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের নিয়ে আলোচনা হয়।
এছাড়া ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস জর্জ মারিও বার্গোগ্লিও এবং ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুতে সংসদে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়। সাবেক বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের মৃত্যুতেও শোক প্রস্তাবে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের নিয়ে আলোচনার সময় সংসদের শোক প্রস্তাবে ওসমান হাদি, আবরার ফাহাদ ও ফেলানি খাতুনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন জানান সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ কেউ যেন সংসদে বক্তব্য দিতে না পারেন, সেই আহ্বানও জানান তিনি।
এছাড়া প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
প্রিন্ট করুন





Discussion about this post