Print Date & Time : 16 January 2026 Friday 3:22 am

স্বর্ণ ব্যবস্থাপনাকে সাজিয়ে শিল্পে রূপ দিতে হবে

ভারতীয় উপমহাদেশের নারীসমাজের মধ্যে বিশেষ করে বাঙালি নারীদের মধ্যে স্বর্ণালংকারের ব্যাপক প্রচলন দেখা যায়। কী শহর, কী গ্রাম—সর্বত্রই স্বর্ণালংকার সজ্জিত হয়ে থাকতে নারীদের বেশি পছন্দের। আর বিবাহযোগ্য মেয়েরা বিয়ের আগে বা পরে অলংকারকে নিজের সম্মানের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। কোনো মেয়ের স্বর্ণালংকারে ঘাটতি থাকলে মা-বাবা কিংবা স্বামীর কাছে তার আফসোসের শেষ থাকে না।

পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা সমাজে যেন তার সম্মান রক্ষা হয় না। মূল্যের বিচারেও সমাজে স্বর্ণ প্রাধান্য পায়। এসব কারণে স্বর্ণের বাজার ব্যবস্থাপনা আজ কল্পনাতীতভাবে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে। আর এ ব্যবস্থাপনা দিনে দিনে শিল্পে রূপ পেয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেভাবে এই শিল্প সুগঠিত হয়নি।

গত বুধবার বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নেতাদের সঙ্গে ‘মিট দ্য বিজনে’ সংলাপে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, দেশের জুয়েলারি খাতে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার জরুরি। নীতিগত সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন এবং সরকার ও শিল্প-অংশীদারদের নিবিড় সহযোগিতার মাধ্যমে এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

স্বর্ণ খাত আমাদের দেশের সামাজিক, আবেগীয় এবং আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। কিন্তু সেই অর্থে এই খাত পরিপূর্ণতা পায়নি। গড়ে ওঠেনি বিশ্বমানের বড় বড় স্বর্ণ রিফাইনারি বা জুয়েলারি কারখানা।

এই খনিজ পণ্যটি বৈধ-অবৈধ নানা পথ পেরিয়ে পৌঁচ্ছে যায় ভোক্তাদের চাহিদার কিনারে। এখন আগের চেয়ে দেশে যেমন ক্রেতা বেড়েছে, সমান হারে বেড়েছে স্বর্ণের দোকান। শহর-গ্রাম সর্বত্র ক্ষদ্র পরিসরে হলেও এখন স্বর্ণের ব্যবসায়ী পাওয়া যায়।

স্বর্ণ ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন-প্রক্রিয়া পৃথিবীর নানা দেশে শিল্পে রূপ পেয়েছে। মালা, বালা, চুড়িসহ উৎপাদিত নানা ধরনের অলংকার দেশ-বিদেশের গণ্ডি পেরিয়ে ক্রেতাদের দোরগোড়ায় চলে আসছে। চাহিদার বিকাশমান ধারায় এই পণ্যটি অনেক দেশে শিল্পে রূপ পেয়েছে। দেশে দেশে গড়ে উঠেছে বৃহৎ আকারের কর্মীবেষ্টিত কারখানা।

ইউরোপ আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বড় বড় স্বর্ণ রিফাইনারি কারখানা গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে দুবাইয়ের স্বর্ণের করাখানাগুলো থেকে পৃথিবীর অনেক দেশে স্বর্ণ রপ্তানি হয়। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অনেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী দুবাইয়ের স্বর্ণ কারখানাগুলোর স্বত্বাধিকারী। সেই তুলনায় আমাদের দেশ এগিয়ে আসতে পারেনি। এক কথায়, এদেশে স্বর্ণ ব্যবসা তেমনটা শিল্পে রূপ পায়নি। নানা নিয়মনীতি ও করজালে বন্দি থাকায় অনেক ব্যবসায়ী চোরাচালানের মাধ্যমে আসা স্বর্ণকে ব্যবসার পণ্য বানাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। আজও সেই বিকল্প অবৈধ পথকে অনেক ব্যবসায়ী সমীহ করে ব্যবসা করে চলেছেন। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

স্বর্ণ এখন পুরোদস্তুর শিল্প। এ শিল্পে লাখো কর্মীর কর্মসংস্থানসহ কোটি কোটি টাকার পণ্য আদান-প্রদান করা হয় প্রতিনিয়ত। এমন একটি শিল্প-ব্যবসাকে কোনোভাবে কোনো প্রতিন্ধকতায় আটকে থাকতে দেওয়া যায় না। সরকার, ব্যবসায়ীসহ সব ধরনের অংশীজনদের নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নীতিমালা তৈরি করতে হবে। সেই আলোকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বৈশ্বিকধারায় স্বর্ণ-ব্যবস্থাপনাকে শিল্পে রূপ দেওয়ার কথা ভাবতে হবে।