রোদেলা রহমান : স্বার্থপর এক জাতিতে পরিণত হচ্ছি আমরা!? এই কথাটা শুনে হূদয় কেঁপে ওঠে, কিন্তু বাস্তবতা এটাই বলছে। ৩০ বছর আগে বাংলাদেশ ছিল দারিদ্র্যের ছায়ায় আচ্ছন্ন, কিন্তু মানুষের মনে ছিল পরস্পরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। আজ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে—জিডিপি বেড়েছে, শহর উঠেছে আকাশছোঁয়া ভবনে কিন্তু এর বিনিময়ে হারিয়েছি নীতি-নৈতিকতা, পরোপকারের চেতনা। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম ইসলামী মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, সামাজিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বউ-বাচ্চার বাইরে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুর খবর রাখার সময় নেই; দেশপ্রেম? সেটা শুধু মুখের কথা। পশ্চিমা ‘আমি-কেন্দ্রিক’ মানসিকতা গ্রহণ করেছি, কিন্তু তাদের সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দানশীলতা, দেশপ্রেম থেকে অনেক পিছিয়ে। নিজে খাব, নিজে বড় হবো—দেশের ক্ষতি হোক, কী সমস্যা? সমাজে এমন লাখো মানুষ আছেন যারা বাজে কাজে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করেন, পরিবারের মানুষের হাত-খরচ মাসে লাখ টাকা। বছরে বিদেশ ভ্রমণে ব্যয় করেন কোটি টাকা। কিন্তু কাজের বুয়া, দারোয়ান, ড্রাইভার ও নিম্নবেতনের কর্মীদের বছরে দুই হাজার টাকা বেতন বাড়াতে তাদের কলিজা ফেটে যায়। এ রকম স্বার্থপরতা আমাদের জাতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর এটাই এখন ট্রেন্ড। এটা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই!
কল্পনা করুন এক গ্রাম্য ছেলে, যে ৩০ বছর আগে তার শেষ রুটি প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে নিত। আজ তার ছেলে শহরে ব্যবসা করে, লাখ টাকা আয়, কিন্তু প্রতিবেশী বুড়োর ঘরে আলো নেই। খাবার জুটছে কি-না, কোনোদিন উঁকি দিয়েও দেখে না। এই রূপান্তর অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফল নয়, মূল্যবোধের ক্ষয়ের। আমরা পশ্চিমা জীবনধারায় ডুবে গেছি কিন্তু জাপানের মানুষের ‘ওয়া’ সংস্কৃতি দেখুন—সমষ্টির প্রতি ভালোবাসা, ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জাপান উঠে দাঁড়িয়েছে এই দেশপ্রেমের জোরে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোয় দানশীলতা অভূতপূর্ব—নরওয়ে, সুইডেনে ট্যাক্সের বড় অংশ সমাজকল্যাণে যায়। কারণ তারা বিশ্বাস করে সমাজের উন্নতিতেই নিজের ভালো। ওয়ার্ল্ড গিভিং ইনডেক্সে ইন্দোনেশিয়া শীর্ষে, যেখানে ৯০ শতাংশ মানুষ দান করে। বাংলাদেশ ৬৯তম, মাত্র ২২ শতাংশ দান করে—এটাই আমাদের স্বার্থপরতার লজ্জাজনক প্রমাণ। জার্মানিতে ন্যায়পরায়ণতা আইনের সামনে সবাই সমান করে তোলে দুর্নীতি দূরে রাখে; আমেরিকায় দেশপ্রেম ফুটে ওঠে স্বেচ্ছাসেবায়, লাখ লাখ মানুষ দান করে। এসব দেশ আমাদের শিক্ষা দেয় যে, স্বার্থপরতা ধ্বংস ডেকে আনে, পরোপকারই সমৃদ্ধি।
ইসলামি শিক্ষা এই স্বার্থপরতার সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যারা তাদের ধন-সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা সাতটি শীষ জন্মায়, প্রত্যেক শীষে শতকোটি দানা।’ দান সম্পদ কমায় না, বরং বাড়ায়। প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকলে তুমি মুমিন নও—এই শিক্ষা পরোপকারকে জীবনের কেন্দ্র করে। দান পাপ জলের মতো নিভিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা ৯০ শতাংশ মুসলিম হয়েও জাকাত পুরোপুরি পালন করি না, প্রতিবেশীর খবর রাখি না। অন্য ধর্মেও একই বার্তা—বৌদ্ধধর্মে পরোপকার মোক্ষের পথ, খ্রিষ্টধর্মে ‘তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো’। দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন, ‘সমাজের কল্যাণই ব্যক্তির কল্যাণ’। অ্যারিস্টটল বলেন, ‘বন্ধুত্বের উৎস নিজের প্রতি ভালোবাসা থেকে আসে, কিন্তু তা অন্যের প্রতি বিস্তারিত হবে’। দালাই লামা বলেন, ‘পরোপকারই সুখের চাবি’। গান্ধী বলেন, ‘স্বার্থত্যাগই দেশসেবা’—এসব শিক্ষা আমাদের স্বার্থপর মানসিকতাকে লজ্জায় ভিজিয়ে দেয়।
বাংলাদেশে কিছু মানুষ আছেন যারা অন্যের জন্যও ভাবেন ও কাজ করেন। তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। তারা নীরবে কাজ করে যান। তাদের আয়ের একটা অংশ মানুষের পেছনে ব্যয় করেন। অনেকে টাকা-পয়সা দিয়ে না পারলেও চাকরি, পরামর্শ, নানা তদবির করে উপকার করেন। এটি আর্থিক সহায়তার চেয়ে অনেক বড়। এক তথ্যমতে, এ দেশের মাত্র ২২ শতাংশ মানুষ অন্যের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ান। এটি স্বার্থের জয়, যা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে ফাঁকা করে দিচ্ছে। জাপান, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, আমেরিকার মতো দেশগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে দেশপ্রেম ও পরোপকার ছাড়া কোনো জাতি টেকসই থাকতে পারে না।
আমার মতামত স্পষ্ট—এই স্বার্থপর জাতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ইসলামি শিক্ষা ফিরিয়ে আনতে হবে—কোরআনের দানের আয়াত, প্রতিবেশী প্রীতির বাণী। জাপানের দেশপ্রেম, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দানশীলতা, আমেরিকার স্বেচ্ছাসেবা আমাদের পথ দেখায়। দেশপ্রেম ফিরিয়ে আনতে হবে—নিজের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। তবেই বাংলাদেশ হবে সত্যিকারের সমৃদ্ধ, যেখানে অর্থনীতির সঙ্গে মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটবে। প্রতিবেশীর সঙ্গে রুটি ভাগ করে খাওয়া সেই গ্রাম্য ছেলের গল্প আমাদের সবার স্বার্থপরতা ত্যাগ করে পরোপকারের আলোয় জ্বলজ্বল করার। এটাই একমাত্র পথ, না হলে ধ্বংস অনিবার্য।
তাহলে কী দাঁড়াল? যে উন্নতির আশায় মানুষ গ্রাম থেকে শহরে এসেছিল, এই আধুনিক রাজধানী গড়ে তুলেছিল, সেই উন্নতির পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষগুলো স্বার্থপরে পরিণত হওয়ায় তাদের হাতেই সেই স্বপ্নের শহর, সেই মনুষ্য জাতি নিজেদের জীবন ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ তাদের মধ্যে এ নিয়ে কোনো ভাবনাই নেই। একজন ডাক্তার তার রোগীর টাকা না থাকলে চিকিৎসাসেবা দেয় না, বিদ্যালয়ের ফি না দিলে শিক্ষক পাঠদান করে না, ক্ষুধার্ত ব্যক্তি রাস্তার পাশের রেস্তোরাঁয় গরম ধোঁয়া ওঠা রুটির দিকে চেয়ে থাকে এই দৃশ্য দেখে দেখে আর কত অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে যাওয়া যাবে সেই ভাবনাই ভাবতে থাকি।
কেবল বড় লোকদের দোষ দিয়ে লাভ কী? কাঁচা বাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা সকালে এক কেজি বিক্রি করছিল ৯০-১০০ টাকায়। বিকেলে খবর পায় আড়তে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তার দোকানের আগে থেকে মজুত থাকা ৯০-১০০ টাকার পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে ১৪০-১৫০ টাকা আদায় করতে শুরু করে। এই অযৌক্তিক মুনাফা করার লোভ কয়জন বিক্রেতাই বা সামলে রাখতে পারে?
একজন রিকশাচালক ভাড়া নির্ধারণ করে না উঠলে যাত্রীর কাছে বেশি ভাড়া দাবি করেন। এ নিয়ে তার লক্ষী খদ্দেরের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করতে কখনও ছাড়ে না।
আবার কল্পনা করুন হঠাৎ কোনো আন্দোলন শুরু হওয়ায় রাস্তা বন্ধ। সবাই বাস থেকে নেমে রিকশা খুঁজছে বিকল্প রাস্তা দিয়ে যাবে। যাত্রী অনেক, এই দেখে ২০ টাকার ভাড়াও ৫০ টাকা হেঁকে বসতে ছেড়েছে কয়জন রিকশাচালক। বলুন তো।
বাজার থেকে একটি জামা কিনেছেন। বাসায় এসে দেখেন ঠিক সাইজমতো হয়নি বা যার জন্য কিনেছেন তার পছন্দ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে পড়েনি এমন লোক দেশে খুব কমই আছে। আবার সেই জামা বদলাতে গিয়ে বিক্রেতার সঙ্গে বসচা করতে হয়নি এমন অভিজ্ঞতাও কম ঘটেছে অনেকের জীবনে। এ কারণে অনেকে হয়তো আর জামা বদলাতে না গিয়ে পরিচিত কাউকে জামাটা গিফট করে দেয়। বিশেষ করে গরিব আত্নীয়দের দিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়।
কিন্তু এই ঘটনাগুলো কেন ঘটে ভেবে দেখেছেন। স্বার্থপর একটা জাতীতে পরিণত হচ্ছি না, বরং হয়ে বসে আছি আমরা। সব সময় কেবল নিজের চিন্তা। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে গেলে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট কিছু পন্থা অবলম্বন করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত জীবনবিধান অনুসরণ করা। পাশাপাশি বিখ্যাত মনীষীদের জীবনাচারণ অনুসরণ করা। তবে ব্যক্তিপর্যায়ে নিজে থেকে অনেকেরই এই শুভবুদ্ধির উদয় হয় না। এ কারণে তাদের এই সুন্দর জীবনের পথে আহ্বান জরুরি। এই কাজটিও আবার একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ কারণেও দলগতভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করি।
প্রত্যাশা করি, এই স্বার্থপরতা মানুষের ভেতর থেকে কমে আসুক। তা কারও পরামর্শে বা উপদেশেই হোক আর নিজের উপলবদ্ধি থেকেই হোক, তা আমাদের সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
প্রিন্ট করুন








Discussion about this post