নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের বিভিন্ন স্থানে অব্যাহত ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির প্রভাবে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ জানিয়েছে, এ পরিস্থিতিতে দেশের অন্তত পাঁচ জেলায় বন্যা হতে পারে। গত কয়েকদিনের ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হাওরপ্রধান এলাকা বা জেলাগুলো, যেমন নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজারের অনেক অংশই পানিতে প্রায় তলিয়ে গেছে। শেয়ার বিজের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানোর তথ্যে এসব খবর জানা গেছে।
এই সময় হাওর অঞ্চলের প্রধান ফসল বোরো ধান। সাধারণত ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত এই সময়টি হাওরে বোরো ধান কাটার সময় বলে জানান কৃষি কর্মকর্তারা।
কিন্তু এবার মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকেই বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি এবং ভারী ও অতিভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এই বোরো ধান কাটার কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছে বলে জানান কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা।
একদিকে ধান কাটা নিয়ে সংকট, আবার আকাশে মেঘ থাকায় কাটা ধান শুকানো নিয়েও বিপত্তির কথা বলছেন চাষিরা। এখন দুদিন থেকেই সংকটে আছেন তারা।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে মাঝারি-ভারী থেকে ভারী এবং অভ্যন্তরে হাওর অববাহিকায় ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে, বলছে বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ ।
নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার নদীগুলোর পানি আগামী তিনদিন বাড়তে পারে পূর্বাভাস দিয়ে এই কেন্দ বুধবার জানিয়েছে, নেত্রকোনা জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
একইসঙ্গে নদীর পানি মৌলভীবাজারের হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে এবং হবিগঞ্জ জেলায়ও বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ ।
এছাড়া আগামী তিনদিন সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়তে পারে ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দেশজুড়ে টানা ভারী বৃষ্টির প্রভাবে কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে এবং কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দেতথ্য অনুযায়ী, ভুগাই, কংস, সোমেশ্বরী ও মগরা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মনু নদী ছাড়া বাকি নদীগুলো নেত্রকোনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। পাশাপাশি সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কেন্দে র উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম বড়ুয়া জানান, এসব নদী আকারে ছোট হওয়ায় ভারী বৃষ্টিতে দ্রুত পানি বৃদ্ধি পায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সুরমার পানি প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার এবং কুশিয়ারার পানি প্রায় এক সেন্টিমিটার বেড়েছে, আর সোমেশ্বরী, কংস ও মনু নদীর পানি দেড় সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, বৃষ্টিপাত কমলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এরই মধ্যে মৌলভীবাজার ও নেত্রকোনার কিছু এলাকায় পানি ঢুকে বন্যা শুরু হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে। এছাড়া ভোলায় ১৫১ মিলিমিটার এবং ফেনীতে ১৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বৃষ্টিপাত একটানা একই স্থানে না হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে থেমে থেমে হতে পারে এবং এই প্রবণতা আগামী ৪ মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
টানা বৃষ্টির প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে পড়তে শুরু করেছে। উজানের ঢলে মৌলভীবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং হাওর এলাকায় পানি বেড়েছে। জেলার কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ মৌসুমে হাকালুকি, কাউয়াদিঘী ও হাইল হাওরসহ মোট ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮২ শতাংশ ফসল ইতোমধ্যে কাটা হলেও ৮৮৭ হেক্টর জমির ধান বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। সদর উপজেলার কাউয়াদিঘী হাওরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। মনু প্রকল্পের আওতায় থাকা কাসিমপুর পাম্প হাউজে নিয়মিত পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ফসলের ক্ষতি বেড়েছে।
রাজনগর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কাউয়াদিঘী হাওরে ৯ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ ফসল কাটা শেষ হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩২৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে।
বরিশাল অঞ্চলেও টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণ ও দমকা হাওয়ায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কাটা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ৬১ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমির পাকা ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাগেরহাটে আগাম সতর্কতার কারণে কৃষকরা ধান কাটতে শুরু করলেও হঠাৎ ভারী বৃষ্টিতে কাজ ব্যাহত হয়েছে। জেলায় ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে, যার অর্ধেকের বেশি এখনো মাঠে রয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, ১২ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হলেও প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা অবস্থায় রয়েছে এবং এর একটি অংশ ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলায় ১৭ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হলেও এখনো প্রায় অর্ধেক ফসল মাঠে রয়েছে। শ্রমিক সংকট ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নেত্রকোনায় নদীর পানি বাড়ায় হাওরে পানি ঢুকছে, ফলে কৃষকদের মধ্যে ধান ঘরে তোলা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলার বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৬৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে কিছু এলাকায় রাতের বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে গেছে এবং কৃষকরা ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে পাহাড়ি ঢলের চাপে বৌলাই নদীর তীরে একটি বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে ঝিনারিয়া হাওরের অন্তত ২৬ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ হেক্টরের ফসল কাটা থাকলেও বাকি অংশ পানিতে ডুবে গেছে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ভেঙে যাওয়া বাঁধটি সরকারি নয়, স্থানীয়ভাবে নির্মিত ছিল।
অন্যদিকে হাওরাঞ্চলে ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার করার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে একটি সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে এ কথা জানান তিনি।
এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বুধবার প্রধানমন্ত্রী জানান, তিন দিন আগে আবহাওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তিনটি জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
একইসঙ্গে সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

Print Date & Time : 1 May 2026 Friday 12:59 am
হাওরে ধান নিয়ে সংকটে কৃষক
শীর্ষ খবর ♦ প্রকাশ: