নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চলমান অভিযানে দেশের হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ভয়ংকর সব অপকর্ম বেরিয়ে আসছে। কোথাও পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাবে ভুয়া চিকিৎসক দিয়ে চলছে অপারেশন, কোনোটির লাইসেন্সই নেই। আবার কোনোটির লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি দীর্ঘদিন। কোনো বিশেষজ্ঞ সার্জন না থাকলেও সাইনবোর্ড দেখা মেলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের দেওয়া হয় ভুয়া ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট, নেই সহকারী চিকিৎসক, দক্ষ নার্স ও আয়া। সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে এসব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে নিতে দৌরাত্ম্য দেখাচ্ছে দালালরাÑএরকম অসংখ্য অনিয়ম ধরা পড়ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ২৩ মার্চ থেকে চলমান অভিযানে।
২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে ১ হাজার ২৮৫টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবৈধভাবে চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪১৫টি অবৈধ প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিভাগে। এরপর রংপুরে ১১১, ময়মনসিংহে ২৫২, রাজশাহীতে ৫৫, চট্টগ্রামে ২৪০, বরিশালে ৪৮, খুলনায় ১৫৬ এবং সিলেটে রয়েছে ৮টি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, চলমান অভিযানে সারাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় অনিয়ম দূরীকরণ এবং স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা হবে। অভিযানের অংশ হিসেবে লাইসেন্স যাচাই, চিকিৎসা সরঞ্জামের মান পরীক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ এবং চিকিৎসকদের বৈধ সনদপত্র যাচাই করা হবে। যেখানে অনিয়ম পাওয়া যাবে, সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা, সিলগালা বা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে ভুয়া ডাক্তার, নার্স ও মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে অভিযানের প্রথম দিনে ৬টি ডায়াগনস্টিক ল্যাব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও চিকিৎসক-নার্স স্বল্পতার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং জরিমানা করা হয় ২টি প্রতিষ্ঠানকে। সিলগালা করা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় দেখা যায়, রিয়েজেন্টের মেয়াদ নেই, জাল স্বাক্ষর দিয়ে চলছে মেডিকেল রিপোর্ট।
এমন চিত্র দেখা গেছে, গরিবের শেষ চিকিৎসাস্থল হিসেবে সুপরিচিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ডিএমসিএইচ) সন্নিকটে চাঁনখারপুলে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিট নেই। এমন অজুহাত দেখিয়ে (যেমন অপারেশন হতে অনেক সময় লাগবে, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাহচার্জ) দালালদের মাধ্যমে হাসপাতালের নিকটবর্তী বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। ভুয়া ল্যাব রিপোর্ট ও চিকিৎসার নামে লুটে নেওয়া হয় বিপুল অঙ্কের অর্থ। দালাল চক্র এতটাই প্রভাবশালী যে, প্রতারিত রোগীরা অভিযোগ করারও সাহস পান না।
এদিকে গতকাল শনিবার রাজধানীর শাহবাগে আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে সোসাইটি অব সার্জনস আয়োজিত ‘সিএমই অন মেডিকেল এথিক্স’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সম্পূর্ণ দুষ্কৃতমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত করতে চাই। যেন আমরা চিকিৎসকদের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য খাতকে একটি সম্মানিত জায়গায় নিয়ে যেতে পারি। আর এটা করা মানে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের উপকার করা। আমার একার পক্ষে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আজকে এখানে আপনারা যারা এসেছেন তারা আপনাদের সহকর্মীদের কাছে আমার এই কথাগুলো পৌঁছে দেবেন।
গত ২৩ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত টানা তিনদিন সারাদেশে অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শনের সময় বেশ কয়েকটি গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে। পরিদর্শনকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তদন্তকারী দল প্রতিষ্ঠানগুলোয় গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত করেন। এ সময় বেশ কয়েকজনকে পাওয়া যায়, যারা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। কিছু হাসপাতালে কোনো অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। কিছু হাসপাতালের পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর ছিল, যা রোগীদের মধ্যে নতুন করে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছিল। এসব অনিয়ম হাতেনাতে ধরা পড়ায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে বেশ কয়েকটি হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ১. সিলগালা করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-ডক্টরস কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ২৩/৬, রূপায়ণ শেলফোর্ড টাওয়ার (৪র্থ তলা), মিরপুর রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭; ২. আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ৬৩, মাজেদ সরদার রোড, নিমতলী, ঢাকা-১০০০; ৩. অ্যাক্টিভ ব্লাড ব্যাংক, ট্রান্সফিউশন অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ৮৫/এ-বি, হোসনী দালান রোড, চাঁনখারপুল, চকবাজার, ঢাকা; ৪. প্রাইম টিজি ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার, ৮৩/৮৪/১, হোসনী দালান রোড, চকবাজার, ঢাকা-১২১১ এবং টিজি মাল্টি স্পেশালাইজড হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার, গাবতলী রোড, কলোনি গেট, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
অভিযান শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। জনস্বার্থে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই ধরনের শুদ্ধি অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।’
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিদর্শন জোরদার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সময়মতো চিকিৎসা কেন্দ্রে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে। এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালকদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরীও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
এই বৈঠকে সিভিল সার্জনদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স, অবস্থা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নিয়ম মানা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। যারা নিয়ম মানবে না, তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই নির্দেশনা অনুযায়ী খুব শিগগিরই দেশব্যাপী এই অভিযান আরও কঠোরভাবে শুরু হবে। এ ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালিত হলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আস্থা ফিরে পাবে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post