নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : পুঁজিবাজারে বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড চলতি ২০২৫-২৬ হিসাববছরের প্রথম ৯ মাসে উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জনের পর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বড় অঙ্কের নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটি এ সময়ে প্রায় ৪৯৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যার একটি বড় অংশ অর্থাৎ নগদ লভ্যাংশ হিসেবে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক (অক্টোবর-ডিসেম্বর) সময়ের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদনের পর। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়েছে।
অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৪৭ টাকা ৫৭ পয়সা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল ৪৪ টাকা ৩৪ পয়সা।
এছাড়া চলতি হিসাববছরের প্রথম ৯ মাসে কোম্পানিটির ইপিএস হয়েছে ১৫৮ টাকা ৯ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ের ১৪৫ টাকা ৬৫ পয়সা থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে ম্যারিকোর শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ৯২ টাকা ২২ পয়সা। ঘোষিত নগদ লভ্যাংশ পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে কোম্পানিটি ২৩ নভেম্বরকে রেকর্ড তারিখ হিসেবে ঠিক করেছে।
এ বিষয়ে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. শাহীনুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, কোম্পানির টেকসই প্রবৃদ্ধি ও শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবেই নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রেখে নিয়মিত ও আকর্ষণীয় লভ্যাংশ প্রদান কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। ভবিষ্যতেও কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড।
২০০৯ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড। বর্তমানে কোম্পানিটি ‘এ’ ক্যাটেগরিতে আছে। নারিকেল তেলসহ বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে দেশে শীর্ষস্থানে রয়েছে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড। কোম্পানিটির উৎপাদিত পণ্যগুলোর চাহিদা প্রতি বছরই আকর্ষণীয় হারে বাড়ছে।
ম্যারিকো বাংলাদেশ ২০০০ সালের জানুয়ারিতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে এবং ২০০২ সালে তাদের গাজীপুর উৎপাদন কেন্দ্রে উৎপাদন শুরু করে। পরে তারা ২০১২ এবং ২০১৭ সালে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সম্প্রতি কোম্পানিটি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি নতুন প্ল্যান্টে বিনিয়োগ করেছে।
এদিকে শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের ১৭ বছরের বকেয়া বাবদ প্রায় ১ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা পরিশোধের দাবিতে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে ঢাকার শ্রম আদালতে মামলা করেন কোম্পানিটির সাবেক ৯৪ জন শ্রমিক।
২০২৫ সালের ৮৬৫ নম্বর মজুরি মামলায় তারা শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল (ডব্লিউপিপিএফ) ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল (ডব্লিউডব্লিউএফ) থেকে তাদের প্রাপ্য অর্থ দাবি করেছেন।
গত ২০ জানুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানিয়েছিলেন মামলার ১নং বাদী ও এক্স ম্যারিকোনিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান।
তিনি বলেন, ২০০৬ সালের ১১ অক্টোবর ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ কার্যকর হওয়ার পর ওই আইনের ২৩৪ ধারা অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডে শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন করার আইনগত বাধ্যবাধকতা ছিল। পাশাপাশি ২৩২ ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধন এক কোটি টাকা বা স্থায়ী সম্পদের মূল্য ন্যূনতম দুই কোটি টাকা হলে এসব তহবিল গঠন বাধ্যতামূলক।
অভিযোগ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এসব তহবিল গঠন করেনি। ২০১৪ সালে তহবিল গঠন করা হলেও পূর্ববর্তী সময়ের প্রাপ্য অর্থ শ্রমিকদের পরিশোধ করা হয়নি। এ বিষয়ে ২০১৪ সালে আইনি নোটিশ দেওয়া হলে কোম্পানির পক্ষ থেকে শ্রমিকদের মজুরি হিসেবে প্রদেয় অর্থ ছাড়া তহবিলের ন্যায্য পাওনা পরিশোধে অস্বীকৃতি জানানো হয়। এরপর ওই বছর ম্যারিকোর সাবেক ১৯ শ্রমিক শ্রম আদালতে ৬৯১ নম্বর মজুরি মামলা দায়ের করেন।
মাহফুজুর রহমান বলেন, শ্রম আইন ২০০৬-এর ২৩৪ ও ২৪০ ধারা অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে প্রাপ্য অর্থ এবং কোম্পানির বিনিয়োগ থেকে অর্জিত লভ্যাংশসহ মোট পাওনা আদায়ের দাবিতে বর্তমানে দুইটি মামলায় মোট ১১৩ জন শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকার পর শ্রমিকরা দেশের দুটি স্বনামধন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ফার্মের মাধ্যমে কোম্পানির প্রকাশিত অডিট রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে প্রায় ১৮২৩ কোটি টাকার সনদ গ্রহণ করেন, যা আদালতে দাখিল করা হয়েছে।
