Print Date & Time : 17 April 2026 Friday 7:58 pm

২০০ কোটি মানুষ যুক্ত হলো ২৭ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে

শেয়ার বিজ ডেস্ক: প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে একটি ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করেছে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। উভয় পক্ষই এই চুক্তিকে ‘মহাচুক্তি’ বা মাদার অব অল ডিলস হিসেবে অভিহিত করেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাজার একত্রিত হলো, যার সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মঙ্গলবার ঘোষিত এই চুক্তিটি এমন এক সময়ে চূড়ান্ত হলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমিয়ে বাজার বহুমুখীকরণের কৌশলের অংশ হিসেবেই ভারত ও ইইউ এই চুক্তিতে পৌঁছেছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা সোমবার নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে অংশ নেন। এর পরদিনই চুক্তির ঘোষণা আসে।

ভারত-ইইউ সম্মেলনের আগে এক ভার্চ্যুয়াল জ্বালানি সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি বলেন, `এই চুক্তি ভারত ও ইউরোপের জনগণের জন্য বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং আমাদের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।’

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেন, `ইউরোপ ও ভারত আজ ইতিহাস তৈরি করেছে। ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল উভয় পক্ষকেই সমানভাবে লাভবান করবে।’

চুক্তির আওতা ও গুরুত্ব: এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় পণ্য, সেবা ও বিনিয়োগ—সবই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও বিস্তৃত বাণিজ্যিক চুক্তি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ১৪৪টি উপখাতে ভারতকে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে, আর ভারত ইইউ-এর জন্য আর্থিক সেবা, সমুদ্রবন্দর ও টেলিযোগাযোগসহ ১০২টি উপখাত উন্মুক্ত করছে।

২০২৩ সালে ইইউ ভারতের জন্য জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করায় ভারতীয় রপ্তানিকারকরা উচ্চ শুল্কের মুখে পড়েছিল। নতুন এই চুক্তির ফলে বস্ত্র, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, ইস্পাত, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খাতে বড় সুবিধা পাবে ভারত।

অটোমোবাইল খাতেও ছাড়: দীর্ঘদিনের সংরক্ষণবাদী অবস্থান থেকে সরে এসে ভারত প্রথমবারের মতো ইইউ দেশগুলোর জন্য তাদের অটোমোবাইল বাজার আংশিকভাবে উন্মুক্ত করছে। ইউরোপীয় গাড়ির ওপর শুল্ক ৩০–৩৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে, যা ধাপে ধাপে ১০ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ১৫ হাজার ইউরোর কম মূল্যের গাড়ি এই চুক্তির বাইরে থাকছে।

বৈদ্যুতিক গাড়ি খাতে দেশীয় বিনিয়োগ সুরক্ষায় প্রথম পাঁচ বছর শুল্ক ছাড় না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত।

ইইউ কীভাবে লাভবান হবে: ইইউ কর্মকর্তাদের মতে, ভারতে রপ্তানিকৃত ইউরোপীয় পণ্যের ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশে শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার বা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে। এর ফলে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে।

যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, ওষুধ, উড়োজাহাজ ও মেডিকেল যন্ত্রপাতির প্রায় সব পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ওয়াইন ও স্পিরিটের ওপর উচ্চ শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হবে।

ভারতের প্রাপ্তি: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের ৯০ শতাংশ পণ্যের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে শুল্ক তুলে নেবে। সাত বছরের মধ্যে এই সুবিধা ৯৩ শতাংশ পণ্যে সম্প্রসারিত হবে। এর ফলে ইউরোপে ভারতের গড় শুল্ক হার ৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসবে।

চিংড়ি ও মৎস্যজাত পণ্য, বস্ত্র, তৈরি পোশাক, চামড়া, রাসায়নিক, ধাতু এবং রত্ন ও অলঙ্কার খাত সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাণিজ্য চিত্র: ২০২০ সালে ভারত-ইইউ পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৬ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে পণ্য বাণিজ্যে ইইউ ভারতের বৃহত্তম অংশীদার। এই বাণিজ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত রয়েছে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

উভয় পক্ষ আশা করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া: এই চুক্তিকে ভালো চোখে দেখেনি যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউস একে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট অভিযোগ করেছেন, রাশিয়ার তেল কেনার পরও ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে ইউরোপ কার্যত নিজেদের বিরুদ্ধেই কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য যুদ্ধের চাপ থেকেই ভারত ও ইইউ দ্রুত এই চুক্তি চূড়ান্ত করেছে।

অর্থনীতিবিদ বিশ্বজিৎ ধর বলেন, ‘বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই চুক্তি ভারত ও ইইউ—উভয় পক্ষের জন্যই স্থিতিশীলতার একটি নিশ্চয়তা।’

সূত্র: আল জাজিরা