টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নাটকীয় এক ম্যাচে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আবারও ফাইনালে উঠেছে ভারত। ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ মিস যেন পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুর্দান্ত ব্যাটিং করেন সঞ্জু স্যামসন এবং ভারতের জন্য গড়ে দেন বিশাল স্কোর। শেষ পর্যন্ত ৭ রানের রোমাঞ্চকর জয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে সূর্যকুমার যাদবের দল।
আগামী রবিবার আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ভারত। যদি সেই ম্যাচে জয় আসে, তাহলে টানা দ্বিতীয়বারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়বে ভারতীয় দল।
সেমিফাইনালের তৃতীয় ওভারে ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে বড় নাটকীয় মুহূর্ত। জফ্রা আর্চারের বলে সঞ্জু স্যামসনের সহজ একটি ক্যাচ ফেলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। সাধারণত এমন ক্যাচ তিনি কখনও মিস করেন না, কিন্তু এই একটি ভুলই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের জন্য বড় বিপর্যয় হয়ে দাঁড়ায়।
সঞ্জু তখন মাত্র ১২ রানে ছিলেন। সেই জীবন পাওয়ার পর তিনি যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে খেলতে শুরু করেন। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে ইংল্যান্ডের বোলারদের উপর ঝড় তোলেন তিনি।
জীবন পাওয়ার পর সঞ্জু স্যামসন আর পেছনে তাকাননি। মাত্র ৪২ বলে ৮৯ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৭টি বিশাল ছক্কা। মাত্র ২৬ বলেই অর্ধশতরান পূর্ণ করেন তিনি।
ওপেনিং থেকেই ইংল্যান্ডের বোলারদের উপর চাপ সৃষ্টি করেন সঞ্জু। জফ্রা আর্চার, জেমি ওভারটনের মতো বোলারদের নির্দ্বিধায় আক্রমণ করেন। তাঁর আগ্রাসী ব্যাটিং ইংল্যান্ডের বোলারদের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে দেয়।
সঞ্জুর সঙ্গে দুর্দান্ত সঙ্গ দেন ঈশান কিশন। তিন নম্বরে নেমে মাত্র ১৮ বলে ৩৯ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৪টি চার ও ২টি ছক্কা।
সঞ্জু ও ঈশানের জুটিতে মাত্র ৮.৩ ওভারে ১০০ রান তুলে ফেলে ভারত। চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এটি দ্বিতীয় দ্রুততম ১০০ রান।
এই জুটি ম্যাচের গতি পুরোপুরি ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দেয়।
চার নম্বরে নেমে ঘরের মাঠে কার্যকরী ইনিংস খেলেন শিবম দুবে। ২৫ বলে ৪৩ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল একটি চার ও চারটি ছক্কা।
অন্যদিকে সূর্যকুমার যাদব এদিন বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। মাত্র ৬ বলে ১১ রান করে আদিল রশিদের বলে স্টাম্পড হয়ে যান তিনি।
তবে ভারতের রান তোলার গতি একটুও কমেনি।
ইনিংসের শেষদিকে দ্রুত রান তোলেন হার্দিক পাণ্ডিয়া। মাত্র ১২ বলে ২৭ রান করেন তিনি। অন্যদিকে তিলক ভার্মা ৭ বলে ২১ রান করে দলের স্কোর আরও বাড়িয়ে দেন।
সব মিলিয়ে ভারত ২০ ওভারে ৭ উইকেটে তোলে ২৫৩ রান। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এটি অন্যতম বড় স্কোর।
ইংল্যান্ডের বোলারদের পারফরম্যান্স ছিল বেশ হতাশাজনক। অনেক সময় তাদের বোলিং ক্লাব পর্যায়ের মতো মনে হয়েছে। লাইন-লেন্থে ছিল না কোনো নিয়ন্ত্রণ।
উইল জ্যাকস ৪০ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন। আদিল রশিদও ৪১ রানে ২ উইকেট পান। জফ্রা আর্চার ৬১ রান দিয়ে ১ উইকেট নেন।
এই ম্যাচে আর্চার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে এক ম্যাচে সবচেয়ে বেশি রান খরচ করার রেকর্ড গড়েন।
২৫৪ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক খেলতে হতো ইংল্যান্ডকে। কিন্তু ভারতের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের সামনে তা সহজ ছিল না।
ইনিংসের প্রথম দিকেই বড় ধাক্কা খায় ইংল্যান্ড। হার্দিক পাণ্ডিয়ার প্রথম বলেই আউট হন ফিল সল্ট।
এরপর জসপ্রীত বুমরাহের প্রথম বলেই আউট হন অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। শুরুতেই দুই গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে ইংল্যান্ড।
ইংল্যান্ডের হয়ে একাই লড়াই চালিয়ে যান জ্যাকব বেথেল। অসাধারণ ব্যাটিং করে মাত্র ৪৮ বলে ১০৫ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৭টি ছক্কা।
বেথেল যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন, ভারতীয় দলকে বেশ চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে। তাঁর সঙ্গে উইল জ্যাকস মিলে ৩৯ বলে ৭৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন।
জ্যাকস ২০ বলে ৩৫ রান করেন, যার মধ্যে ছিল ৪টি চার ও ২টি ছক্কা।
ইংল্যান্ড ১৭২ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর ম্যাচে ফিরে আসা কঠিন হয়ে যায়। তবুও বেথেল চেষ্টা চালিয়ে যান।
কিন্তু শেষ ওভারে বেথেল রান আউট হওয়ায় ইংল্যান্ডের শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ২৪৬ রান করতে পারে ইংল্যান্ড।
ফলে ৭ রানের রোমাঞ্চকর জয় পায় ভারত।
ভারতের হয়ে সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন হার্দিক পাণ্ডিয়া। তিনি ৩৮ রান দিয়ে ২টি উইকেট নেন।
জসপ্রীত বুমরাহ ৩৩ রান দিয়ে ১ উইকেট পান। অক্ষর প্যাটেল ৩৫ রান দিয়ে ১ উইকেট নেন। অর্শদীপ সিংও একটি উইকেট নেন।
যদিও বরুণ চক্রবর্তী ৬৪ রান খরচ করে ১টি উইকেট পান, তবুও ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট এনে দেন তিনি।
এই জয়ের মাধ্যমে চতুর্থবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল ভারত। এবার প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।
রবিবার আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল ম্যাচ। সেই ম্যাচ জিততে পারলে ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়বে ভারত।
ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন অপেক্ষা করছেন সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্য।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post