চট্টগ্রাম ব্যুরো : অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে জ্বালানি তেল নিয়ে একাধিকবার বিপাকে পড়লেও, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এবার বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। তবে এই পরিস্থিতি নতুন কোনো সংকট তৈরি করেনি; বরং দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। সীমিত মজুত, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং বিনিয়োগের ধীরগতির কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন প্রশ্নের মুখে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি হঠাৎ সৃষ্ট সমস্যা নয়; বরং বছরের পর বছর কৌশলগত মজুত বাড়াতে ব্যর্থতার ফল এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বাড়ানো যায়নি কৌশলগত জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নানা দীর্ঘসূত্রতায় এখনও ঝুলে আছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ। এমনকি সাগরে ভাসমান পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাসের জন্য গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ এসপিএম প্রকল্পটিও এখনও পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি; যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা প্রায় সোয়া ১১ লাখ টন। যার মধ্যে পরিশোধিত তেল-ডিজেল ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন, অকটেন ৫৩ হাজার ৬১৬ টন, পেট্রোল ৩৭ হাজার ১৩ টন, ফার্নেস অয়েল ১ লাখ ৪৪ হাজার টন, জেট ফুয়েল ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন। বাকি ২ লাখ ২৫ হাজার টন অপরিশোধিত। তবে বাস্তবে এই মজুত দেশের চাহিদার তুলনায় খুবই সীমিত। বিপিসির অধীন ২৭টি ডিপো এবং একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ট্যাংকগুলোতেই এই মজুত। নদীপথ, রেলহেড ও বার্জ ডিপো মিলিয়ে সক্ষমতা অপর্যাপ্ত। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন তলানিতে, তখন আপৎকালীন সময়ের জন্য কমপক্ষে ৬০ দিনের তেলের মজুত সক্ষমতা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। কিন্তু গত ছয় বছরেও সেই সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে দেশে তেলের ধারণক্ষমতা বা মজুত আছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহƒত জ্বালানি ডিজেলের মজুত আছে মাত্র ১০ থেকে ১১ দিনের। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে এখন তেলের মজুত রয়েছে ৭৪ দিনের, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় ৩০ দিন এবং নেপালে আছে ১০ দিনের মজুত। এ ছাড়া এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভিয়েতনামে ৪৫ দিন, থাইল্যান্ডে ৬১ দিন এবং জাপানে ২৫০ দিনের তেলের মজুত রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জানান, বাংলাদেশের মতো দেশে ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মজুত সক্ষমতা আসলে কোনো সক্ষমতাই নয়। একে কোনোভাবেই আপৎকালীন সক্ষমতা বলা যায় না; এটি কেবল দৈনন্দিন পরিচালনের মজুত ছাড়া আর কিছুই নয়। জ্বালানি খাতে একাধিক বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা স্পষ্ট। দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের উদ্যোগ প্রায় ১৬ বছর ধরে ঝুলে আছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের পরিশোধন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার পাশাপাশি মজুত ক্ষমতাও তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারত। কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় সেটি এখনও অনিশ্চিত। একইভাবে মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাসের জন্য নেওয়া সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্পও পুরোপুরি চালু হয়নি। এই প্রকল্পে প্রায় সোয়া দুই লাখ টন তেল মজুতের সুযোগ থাকলেও অপারেটর নিয়োগ জটিলতায় তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাস্তব মজুত সক্ষমতা বাড়ছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, মজুত সক্ষমতা না বাড়ার পেছনে বড় কারণ রয়েছে তেল বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর অদক্ষতা ও পরিকল্পনার অভাব। তেল বিতরণ কোম্পানিগুলো জ্বালানি তেলের ধারণক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামোগত বিনিয়োগের চেয়ে ব্যাংকে টাকা ফেলে রেখে সুদ পেতেই বেশি আগ্রহী। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। দেশের সবচেয়ে পুরোনো তিন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের মূল কাজ বিপিসির আমদানি করা তেল বিতরণ করা। এই তিন কোম্পানির অধীনে সারাদেশে ২ হাজার ৩০৭টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে এবং দেশের তেল মজুতের বেশির ভাগ ট্যাংকারও তাদেরই নিয়ন্ত্রণে। প্রতিটি কোম্পানির কাছে লভ্যাংশের প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা অলস পড়ে আছে; যা বিভিন্ন ব্যাংকে জমা রেখে প্রতিবছর তারা শত শত কোটি টাকা সুদ হিসেবে মুনাফা করছে। গত অর্থবছরে প্রতিটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ৫০০ কোটি টাকার বেশি লাভ করেছে। কিন্তু তেল ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি বা মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ তাদের নেই। উল্টো প্রতিবছর এই কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লাখ লাখ টাকা বোনাস নিচ্ছেন।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর ৭০ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল ব্যবহƒত হয়, যার মধ্যে ডিজেলের পরিমাণই ৪০ লাখ টনের ওপরে। আগামী ৫ বছরে এই চাহিদা ১ কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে। এই চাহিদা পূরণে বড় অংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। কিন্তু তেলের দাম বাড়লে এই রিজার্ভ দ্রুত কমে যেতে পারে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের আয়েও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে; যা রেমিট্যান্স প্রবাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সদস্য অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম জানান, জ্বালানি নিরাপত্তা যে কোনো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে জ্বালানি খাতের কাঠামো কী হবেÑতা নিয়ে সরকার এখনও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। অর্থাৎ খাতটি পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হবে, নাকি সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানায় থাকবেÑএই মৌলিক প্রশ্নটি এখনও অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। যদি জ্বালানি খাতকে পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে মুনাফাভিত্তিক খাতে পরিণত করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তেলের কৌশলগত মজুত বা সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক জিএম প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম জানান, এসপিএফের মহেশখালীর স্টোরেজ সুবিধাগুলো এখনও পুরোপুরি খালি রয়েছে। ডিজেল ও ক্রুড অয়েলের ট্যাংকগুলোতেও তেল সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা খালি আছে। ফলে এ মুহূর্তে তেল সংরক্ষণে কোনো সংকট নেই। যদিও অটোমেশন ও ইন্সট্রুমেন্টেশন ব্যবস্থা এখনও সম্পূর্ণভাবে চালু হয়নি, তবুও ম্যানুয়ালি তেল গ্রহণ ও সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে সেখানে তেল আসছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেখান থেকে তেল সরবরাহও করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিন ধরে যেসব প্রকল্প ঝুলে আছে এবং যেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি, সেগুলো দ্রুত কার্যকর না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য জ্বালানি মজুত কেবল একটি খাতভিত্তিক বিষয় নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলছেন বিশ্লেষকরা।
