ধারাবাহিক

করারোপ ও বিনিয়োগ দর্শন

মিজানুর রহমান শেলী: ৩০ বছর আগে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আসলে কেউই বুঝতে পারেনি। মজুরি ও দামের সীমাবদ্ধতা, দুটি তেলের মজুতে ধস, রাষ্ট্রপতির অব্যাহতি, সোভিয়েত ইউনিয়নে ভাঙন, ডৌ অব ৫০৮ পতন, ট্রেজারি বিলের ওঠানামা প্রভৃতিকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। কিন্তু এত দুর্ঘটনার পরও বেন গ্রাহামের বিনিয়োগী নীতিতে কোনোই পরিবর্তন ঘটল না। এমনকি সহনীয় দামে ভালো ব্যবসাগুলোর দরকষাকষি ক্রয়েও কোনো অসুস্থ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারেনি। ভয় বা আশঙ্কা যদি অজানা থেকে যায়, তাকে কোনোভাবেই অনুধাবন করা যায় না; তবে আমাদের খরচের দিকটা মাথায় আনুন। কেননা, এ আশঙ্কা আমাদের মূলধন বণ্টনে ভিন্নতা নিয়ে আসতে পারে অথবা বিকল্প কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
হ্যাঁ, এটা সত্য যে, আমরা সব সময়ই একটা ভালো ক্রয়কর্ম সম্পন্ন করার ক্ষমতা রাখি। কার্যত আমরা এটা সব সময়ই করে অভ্যস্ত। আর সাধারণত যখন কোনো ব্যষ্টিক ঘটনা সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধি একেবারে চূড়ায় উঠে যায়, তখনই আমরা এই ক্রয় কাজ উত্তমরূপে সমাধা করে নিই। সাধারণত যারা খেয়ালি ব্যক্তি, তাদের জন্য যে কোনো আশঙ্কা বা ভয় শত্রুর মতো বিপজ্জনক। কিন্তু মৌলবাদীদের কাছে ভয়ের কোনো স্থান নেই। তারা ভয়কে নিজেদের মনে ও কাজে কোনোভাবেই পাত্তা দেয় না। এ রকম মৌলিকতায় বিশ্বাসীদের জন্য যেন ভয়ই তাদের বন্ধু।
হ্যাঁ, একটি কষ্টের দিন অপেক্ষা করছে। আগামী ৩০ বছরের কথা বলছি। এ সময়ে অনেক বড় ধাক্কা নিশ্চিতভাবেই আমাদের আঘাত করে যাবে। আমরা এ ভয়াবহতা নিয়ে আদৌ কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারব না। আসলে এ ভয়াবহতা থেকে আমাদের কোনো সুফল বের করে আনাও সম্ভব হবে না। এটা আমাদের জন্য আসলেই একটি দুর্ভাগ্যের বিষয় বলে মনে হয়। তাহলে আমাদের কী করণীয়? আমরা এমন বিপদের দিনেও অতীতে ব্যবসা করেছি। সে থেকেই আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের অবশ্যই অতীতের শিক্ষা অনুযায়ী এমন কিছু ব্যবসা কিনতে হবে, যেসব ব্যবসা কিনে আমরা ভয়ের দিনে সফলতা পেয়েছি।
আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ফলের ওপর সামান্য কিছু প্রভাব অবশ্য এসে পতিত হবে। এ ব্যাপারে কিছুই করার থাকবে না। আর এ প্রভাবটা সৃষ্টি হবে মূলত বাহ্যিক বিস্ময়ের কারণে।
আসলে আমরা আপনাদের কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম মনে আছে? আমরা অনেক ন্যায্যতার ভিত্তিতে যথাযথ অর্জনের কথা বলেছিলাম। বার্কশায়ারে আমরা যখন মালিক কিংবা আপনি এখানে বিনিয়োগ করে মালিকানা লাভ করবেন, তখন আপনিও এই ন্যায্যতার মধ্যে আসবেন। আপনি সব ধরনের ন্যায্যতার চর্চা করবেন; এমনকি নিজেও ন্যায্যতার সুফল উপভোগ করতে থাকবেন। হ্যাঁ, চার্লি এবং আমিও এই ন্যায্যতার চর্চা ও সুফল সেভাবে উপভোগ করে থাকি।
এমনকি এটা করতে গিয়ে আপনারা যদি ভোগান্তিতে পড়ে যান, তবে মনে রাখবেন, আমরাও আপনাদের মতোই ভোগান্তির মধ্যেই থাকব। আমরা যদি ধন-দৌলতে সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠি, তবে আপনারাও সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠবেন। আসলে আমরা এবং আপনাদের মধ্যে তেমন কোনোই পার্থক্য থাকবে না।
এটি নিশ্চয়ই একটি বন্ধন। এ বন্ধন কখনোই ভাঙবে না। অন্তত আমরা কখনোই এ বন্ধন ছিন্ন করব না। আরও খোলাসা করে যদি বলি, তবে বলতে হয় আপনারা যদি কখনও কোনো ভোগান্তির মধ্যে পড়েন, তবে আমরা কখনোই কোনোভাবে আপনাদের ক্ষতিপূরণ দিতে পারব না। এ বিষয়ে কোনো চুক্তি নেই। নতুন করে এমন কোনো চুক্তি করতে পারব না। যদি কখনও কেউ এটা দাবি করে, আর সেই দাবি যদি আমরা মেনে নিই, তবে আমাদের ঊর্ধ্বগতিতে অনেক বড় অংশগ্রহণ করতে হবে। অথচ নিম্ন গমনেই আমাদের প্রত্যাশা থাকে।
আমরা আবারও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, আমাদের পেশাদারিত্ব নিয়ে কখনোই কোনো ত্রুটি হবে না। এটা নিয়ে কখনও অতীতে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। এখনও উঠছে না। ভবিষ্যতেও উঠবে না। আর বার্কশায়ারের শেয়ারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ের এ প্রতিশ্রুতির ব্যাপক ঘনিষ্ঠতা থাকবে।
আমরা কখনোই আপনাদের বলব না রে, আমাদের এখানেই বিনিয়োগ করুন এবং তারপর সেই অর্থ অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে ছড়িয়ে দিন। উপরন্তু বার্কশায়ার আমাদের পরিবারের সব সদস্যের বিনিয়োগী পোর্টফোলিওর ওপর যেমন আধিপত্য করে, তেমনি বার্কশায়ার তার বিপুলসংখ্যক বন্ধুর ওপর একই প্রভাব খাটিয়ে থাকে, যারা বার্কশায়ারের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে অংশীদার হয়েছে। আর এটা চার্লি আর আমি মিলে ১৯৬০-এর দশক থেকে চালু করেছিলাম। আমরা কখনোই অনেক বেশি পথনির্দেশনা নিতে পারি না। আমরা আমাদের কাজ পরিচালনার জন্য বিশেষত আমাদের নীতি অনুসরণ করেই চলি।
আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছে থাকি আমাদের প্রচেষ্টা, শ্রম দিয়ে। এটা আমাদের একদল অতি চমৎকার ব্যবস্থাপনা কর্মীর দ্বারা সম্ভব হয়ে থাকে। তারা তাদের চমৎকার কর্মদক্ষতা আর প্রচেষ্টার ফসলও পেয়ে থাকে। এটা নিঃসন্দেহ অনন্য এক ব্যাপার। বিপুলসংখ্যক সাধারণের ভিড়ে এটাকে ব্যতিক্রম বলতেই হবে। এখানে আমি কেইসি স্টেইঙ্গেলের কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি বর্ণনা করেন: বাড়ি ভাড়ার অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে একটি বেজবল দল পরিচালনা করার মানে হলো অনন্য সতীর্থদের হিট করতে উৎসাহ জানানো। আমি বার্কশায়ারে এ ফর্মুলাটি খুব ভালোভাবেই ব্যবহার করে থাকি।
এমনকি বলা যায় যে, শতভাগ নকল হীরা নেওয়ার চেয়ে কিছু অংশ মূল্যবান হোপ ডায়মন্ড নেওয়া অনেক বেশি উত্তম। তাছাড়া কোম্পানিও এ পদার্থটি পেয়ে খুশি হবে। তারা এই হোপ ডায়মন্ড পেয়ে কোনো বিরল জহর পাওয়ার ঘোষণা দেবে এবং খুব সহজে এর গুরুত্ব ও মূল্য মূল্যায়ন করতে সক্ষম হবে। সবচেয়ে ভালো কথা হলো, এই উত্তম রতœসম্ভারের কোনো একটি বীজ আমাদের কাছে একেবারেই দুষ্প্রাপ্য, তা নয়। বরং যতই দিন যায়, ততই এ রতেœর সংগ্রহ আমাদের বাড়তেই থাকে।
যাহোক, স্টকের দাম হয়তো স্থির থাকবে না। এটা নিয়ত ধারায় ওঠানামা করতে থাকবে। এমনকি কিছু কিছু সময় এর ওঠানামা খুব খাড়াভাবেই ঘটতে থাকে। কখনও কখনও এটা যেন একেবারে সোজা ওপরের দিকে উঠতে থাকে। আবার কখনও এটা একেবারে সোজা অধঃপতিত হয়। আর একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়তে থাকে সমগ্র অর্থব্যবস্থার ওপর, সমগ্র অর্থসম্পদের পরিমাণে হয়তো কমতি শুরু হয়, নয়তো বাড়তি হতে থাকে। যাহোক, এসব কথায় তেমন কোনো কষ্ট বা হতাশা আমাদের নেই। আমরা এখানে বরং সম্ভাবনা দেখতে পাই। আমরা বলি, আমাদের যেসব ব্যবসা এখনও হাতে রয়ে গেছে, সেসব ব্যবসা এক সময় আমাদের অনেক বেশি অর্থসম্পদ বাড়িয়ে তুলতে থাকবে। এটা যেন একটি চলমান প্রক্রিয়া হয়ে যাবে। তবে এর জন্য আমাদের সময় দিতে হবে। সময়ের পরিক্রমায় আমরা এক সময় এ সুবিধাটি পাব বলে আশা রাখি। বিশেষ করে এসব ব্যবসার ভবিষ্যৎ মূল্যমান আমাদের সন্তুষ্টির পর্যায়ে পৌঁছে দেবে।
আমি মনে, বার্কশায়ারের ব্যবস্থাপনা দলের সঙ্গে আমার আলোচনার এখানেই ইতি টানা উচিত। এটা যেন আজকেই এবং ভবিষ্যতের জন্যই। আমাদের এই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দুয়ার যেন নিশ্চিতভাবেই খুলে গেছে। এটা চলমান থাকবে। ব্যবস্থাপকরা সফল হয়ে গেছেন।

এই দর্শন রচনাবলি সম্পাদনা করেছেন লরেন্স এ. কানিংহ্যাম
অনুবাদক: গবেষক, শেয়ার বিজ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..