প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মোটর ভেহিকেল চুক্তি সম্পাদনে অনিশ্চয়তা

শেয়ার বিজ ডেস্ক: ভুটানের সংসদে আপত্তির কারণে বহু কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ-ভুটান-ইন্ডিয়া-নেপালের (বিবিআইএন) মোটর ভেহিকেল চুক্তি সম্পাদনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিবিআইএনের অন্য সদস্য রাষ্ট্র ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল। খবর পিটিআই।

ভুটান সংসদ সোংডুর উচ্চকক্ষে সম্প্রতি উপস্থাপন করা হয়েছিল চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য। আলোচনার পর ভোটাভুটি। ২৫ সদস্যের মধ্যে চুক্তির পক্ষে ভোট মাত্র দুটি। বিপক্ষে ১৩, অনুপস্থিত ৪ এবং বাকি সদস্যরা ভোট প্রদানে বিরত থাকেন। ভুটানের সংসদ অনুমোদন না দেওয়ায় চুক্তিটি এখন অচল। দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক বিকাশের নিরবচ্ছিন্ন সুলভ সড়ক যোগাযোগের পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, চার দেশের মধ্যে চলাচলে রুট পারমিট নিতে হবে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার সময় মাঝপথে কোনো যাত্রী বা মালামাল তোলা যাবে না। যে দেশের ওপর দিয়ে যানবাহন যাবে, সে দেশের কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে তা তল্লাশি ও পরিদর্শন করতে পারবে। কোনো দেশে নিষিদ্ধ থাকা পণ্য সে দেশের ওপর দিয়ে পরিবহন করা যাবে না বলে চুক্তির খসড়ায় রয়েছে। তিন বছর পরপর এই চুক্তি নবায়ন হবে এবং কোনো দেশ চাইলে ছয় মাসের নোটিসে চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারবে।

ভুটানের সংসদ সদস্যদের আপত্তির যুক্তি অদ্ভুত। তারা বলছেন, পাহাড়ি রাস্তায় দিনরাত হাজার হাজার ট্রাকের গর্জনে মানুষের শান্তি নষ্ট হবে। পোড়া ডিজেলের ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত হবে; পাশাপাশি মানুষের শরীরে বিষ ঢুকবে। অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক বিকাশের কথা ভেবে দেশকে বিনাশের পথে নিয়ে যাওয়া যায় না।

পরিবেশ নিয়ে ভুটানের ভাবনা অনেক বেশি। তার কারণও আছে। বিশ্বের একমাত্র ‘কার্বন সিঙ্ক’ রাষ্ট্র ভুটান। ভুটান যত কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছাড়ে, তার থেকে বেশি গ্রহণ করে। বাতাসের বিশুদ্ধতা বজায় থাকে। দেশটি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সতর্ক। জলবিদ্যুৎ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ রফতানিও করে। রাজধানী থিম্পু যাতে অতিরিক্ত চাপে নাভিশ্বাস না তোলে, তার জন্য প্রশাসনিক রাজধানী করা হয়েছে পারো ডংয়ে। ভুটানের পরিচয় ‘ল্যান্ড অব থান্ডার ড্রাগন’ নামে। যা চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। দেশটি খুবই শান্ত। কোলাহল থেকে মুক্তি পেতেই পর্যটকরা ছোটেন সেখানে। কেন যাবেন না! পূর্ব হিমালয়ের এমন জায়গা আর কোথায়। উত্তরে চীন, বাকি তিনদিকে ভারত। সুউচ্চ পর্বতমালা, উর্বর উপত্যকা, ঘন অরণ্যের অনন্য রূপ।  দেশটির শীর্ষ পর্বতশৃঙ্গ খুলা কাংরি। আমো চু, ওয়াং চু, মাচু ভুটানের অন্যতম নদী। যেগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

চার দেশের মধ্যে সড়কপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে গত ১৫ জুন এক চুক্তিতে সই করেন পরিবহনমন্ত্রীরা। ভুটান সংসদের এ ধরনের সিদ্ধাতে হতাশ অন্য সদস্যরা।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোগবে বিচক্ষণ রাজনীতিক। রাজা জিগমে খেসর নামসিয়ান ওয়াংচুকের সঙ্গে পরামর্শ করেই পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করেন। সার্কের স্বার্থেই মোটর ভেহিকেলস চুক্তিটি অপরিহার্য। পরিবেশ বাঁচিয়ে যান চলাচলে বাধা থাকার কথা নয়। ভুটানের উন্নয়নের জন্য সেটা দরকার। যোগাযোগ না বাড়ালে অর্থনৈতিক বিকাশ কীভাবে সম্ভব! অর্থনৈতিক বিকাশের স্বার্থে নিশ্চয়ই তারা মোটর ভেহিকেলস চুক্তি থেকে দূরে সরে থাকবে না। পুনর্বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে।

বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল এই চার দেশের মধ্যে যান চলাচলে মাশুলসহ অন্যান্য বিষয় চলতি মাসে চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল। ডিসেম্বরে এক বৈঠকে চুক্তির আওতায় যান চলাচলের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশে ‘ট্রানজিট ফি’ ও যাত্রী পরিবহনে ভিসা পদ্ধতি চূড়ান্ত হবে বলে জানানো হয়েছিল। মাশুল ঠিক করা হবে, কোনো আপত্তি উত্থাপিত হলে তাও ঠিক করা হবে। চার দেশের সম্মতিতে এই মাশুল নির্ধারণ করা হবে।

চুক্তি অনুযায়ী, চার দেশের সম্ভাব্য রুট হচ্ছে ভারতের কলকাতা থেকে পেট্রাপোল হয়ে বাংলাদেশের বেনাপোল-যশোর-ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা-হাটিকুমরুল-বগুড়া-রংপুর-বুড়িমারী হয়ে ভারতের চেংরাবান্দা-শিলিগুড়ি এবং ঢাকা থেকে হাটিকুমরুল-বগুড়া-রংপুর-বুড়িমারী হয়ে ভারতের চেংরাবান্দা-জায়াগন হয়ে ভুটানের ফুয়েন্টসুলিং দিয়ে থিম্পু পর্যন্ত। এছাড়া ঢাকা থেকে হাটিকুমরুল-বগুড়া-রংপুর-বাংলাবান্ধা হয়ে ভারতের ফুলবাড়ী-পানিটাংকি দিয়ে নেপালের কাকরভিটা হয়ে কাঠমান্ডু, ভারতের কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ঢাকা-সরাইল-সিলেট-তামাবিল হয়ে ভারতের ডাউকি-শিলং-গুয়াহাটি দিয়ে ভুটানের সামদ্রুপ ঝংকার এবং খুলনা থেকে যশোর-বেনাপোল হয়ে ভারতের পেট্রাপোল দিয়ে কলকাতা পর্যন্ত। চুক্তির প্রস্তাবে চার দেশের সম্মতিতে ভবিষ্যতে এই পথে অন্য যে কোনো দেশের যুক্ত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।