সাধন সরকার : এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান নড়াইল সদরের হিজলডাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এস এম মোমিন ২০২৩ সালের ৩ মার্চ চাকরি থেকে অবসের যান। বয়সজনিত কারণে তিনি বেশ কয়েক বছর যাবত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছিলেন। এই শিক্ষক নিয়ম মেনে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা পেতে অবসর সুবিধা বোর্ডে ও কল্যাণ ট্রাস্টে আবেদন করেন। আবেদন করার দুই বছর পর কল্যাণ সুবিধার টাকা পেলেও অবসর সুবিধার টাকা পাননি। পরিবার সূত্রে জানা যায়, কিডনি বিকল ও লিভার সিরোসিসের মত জটিল সমস্যায় ভুগতে ভুগতে তিনি ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। পরিবার জানায় কিডনি ডায়ালাইসিস, ওষুধ, হাসপাতালের চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ বাবদ ১৯ লাখের মতো টাকা খরচ হয়েছে। পরিবারের প্রধান ব্যক্তি হারানোর শোক আর অর্থ সংকটে পরিবারটি এখন দিশেহারা। পরিবার অবসর সুবিধার টাকা কবে পাবে তা জানা নেই। নিজের জমানো পেনশনের টাকা ভোগ করে যেতে পারলেন না অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।
মুন্সিগঞ্জের লৌহজং বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের কর্মচারী ছিলেন লুৎফা বেগম। ২০২১ সালে তিনি অবসরে যান। এমপিওভুক্ত এই কর্মচারী অবসর ও কল্যাণ সুবিধার আবেদন করেও সময়মতো টাকা পাননি। অতঃপর রোগগ্রস্ত হয়ে সবাইকে কাঁদিয়ে ২০২৩ সালে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। মারা যাওয়ার দুই বছর পর অর্থাৎ আবেদনের চার বছর পর ২০২৫ সালে অবসরের টাকা পায় তার পরিবার। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী তিলে তিলে জমানো নিজের টাকা ভোগ করে যেতে পারেননি। এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এস এম মোমিন ও কর্মচারী লুৎফা বেগমের মতো নয়, চাকরি থেকে অবসরের পর সময়মতো অবসর ও কল্যাণ সুবিধার টাকা না পাওয়ার কারণে পেনশন সুবিধা ভোগ করার আগেই হাজার হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী রোগেশোকে মারা যাচ্ছেন। পুরো চাকরি জীবনে নিজের তিল তিল করে জমানো পেনশনের টাকা পেতে অবসর সুবিধা বোর্ডের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন হাজার হাজার শিক্ষক। কিন্তু সঠিক সময়ে মিলছে না অবসরের শেষ সম্বল পেনশনের টাকা। অবসরের পর চার-সাত বছর পর মিলছে পেনশনের টাকা। এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের যেন দুর্ভোগের শেষ নেই। অবসরের পর পেনশনের টাকা কবে পাবেন শিক্ষক-কর্মচারীরা সেই টেনশনে কাটায় প্রতিটি দিন। বয়সজনিত কারণে বিভিন্ন রোগে জর্জরিত হয়ে পড়েন অনেকে। সংসার চালানো আর রোগের চিকিসা করতে ধারদেনার পথ ধরতে হয় অনেককে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধার জন্য চাকরিকালীন প্রতিমাসের মূল বেতনের ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ সুবিধার জন্য মূল বেতনের ৪ শতাংশ কেটে রাখা (মোট ১০ শতাংশ) হয়। তাহলে নিজের জমানো টাকা পেতে কেন শেষ বয়সে এসে বছরের পর বছর সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হবে? পেনশনের টাকা না পাওয়ায় শেষ বয়সে পরিবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ চালাতে সবার কাছে হেয় হতে হয়। যেসব অবসরপ্রাপ্ত ভুক্তভোগী ব্যক্তি বয়সজনিত কারণে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সেসব পরিবারের অবস্থা আরও করুণ। রোগের চিকিৎসা করতে করতে সবকিছু হারাতে হচ্ছে পরিবারকে! পেনশনের টাকা পাওয়ার আগেই একটা পরিবারের জন্য এর চেয়ে বড় ধাক্কা আর কী হতে পারে! জীবনের পুরোটা সময় ধরে যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোর সন্ধান দিয়েছেন, জীবন সায়াহ্নে এসে সুন্দর জীবনযাপনের অধিকারটুকু তারা কী পেতে পারে না? কেন পেনশনের টাকার আশায় মানুষ গড়ার কারিগরদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে? মহামান্য হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এক রায়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা অবসরের ছয় মাসের মধ্যে প্রদানের নির্দেশ প্রদান করে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের সমস্যা যে তিমিরেই ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশন সমস্যার বিষয় যখনই আলোচনা হয় তখনই অবসর সুবিধা বোর্ডের একটাই কথা- বরাদ্দ নেই। বছরের পর বছর অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের এই বাহানা চলে আসছে। বাংলাদেশের আর কোনো সেক্টরে পেনশনের টাকা পেতে এত দুর্ভোগ পোহাতে হয় না।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এমন দুর্ভোগের মধ্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যাচ্ছে- এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সঞ্চয়ের ৬ হাজার কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেছে। প্রশ্ন জাগে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেনশনের এত বিপুল পরিমাণ অর্থের গায়েব হওয়ার দায় কার? আরও একটি সাম্প্রতিক খরব হলো, বেসরকারি অবসর সুবিধা বোর্ড গাড়ি ক্রয় ও নতুন অফিস ভাড়া নেওয়ার মতো বিলাসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অবসরের পর আর্থিক সুবিধা পেতে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের যেখানে বছরের পর বছর ঘুরতে ঘুরতে জুতার তলা ক্ষয়ে যাচ্ছে সেখানে বোর্ড কর্তৃপক্ষের এমন বিলাসী উদ্যোগ কতটা যৌক্তিক? বেতন-ভাতা কম, পেনশনের টাকা পেতে ভোগান্তিসহ নানা কারণে এমপিওভুক্ত শিক্ষকতা পেশা গুরুত্ব হারাচ্ছে। মেধাবীরা এই পেশায় আকৃষ্ট হচ্ছে না। অথচ মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯৫ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি। সব সেক্টরে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের ছোয়া লাগলেও অবসর সুবিধা বোর্ড এখনো পুরনো ধাঁচেই চলছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা অবসর বোর্ড ও ট্রাস্টের কাজ নয়। অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টকে পরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। পেনশনের টাকা নিয়ে টেনশন সৃষ্টিকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। হাইকোর্টের রায় মেনে শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশন সুবিধা অবসরের ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করা সময়ের দাবি।
সহকারী শিক্ষক
লৌহজং বালিকা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জ।
