মুহম্মদ গোলাম রাব্বি : জলবায়ু-সংক্রান্ত সংকট যখন প্রতি বছর বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে আরও গভীরে ঠেলে দিচ্ছে, তখন ‘গ্রিন ফাইন্যান্স’ শুনলে মনে হয় এটা একটা রক্ষাকবচ। কিন্তু বাস্তবে? এটা কি সত্যিই আমাদের মুক্তির পথ, নাকি আরেকটা ফাঁদ যেখানে ঋণের চক্রে আটকে যাব আমরা? সামপ্রতিক রিপোর্টগুলো দেখলে মনে হয়, এই ‘সবুজ’ নামের পিছনে লুকিয়ে আছে একটা বড় বাস্তবতা, যা আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য আরও কঠিন করে তুলছে।
২০১১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা চালু করার পরপরই ব্যাংকগুলো সোলার প্যানেল লাগাতে শুরু করে, কাগজ কম ব্যবহারের কথা বলে, এমনকি এসি কম চালানোরও প্রচার করে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, এসব তো শুধু সারফেস লেভেলের। আসল কাজ হচ্ছে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার নামে। এই ঋণ, যা অনেক সময় শুধু ব্যবসার মোড়ক। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সামপ্রতিক রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশ এখন হাই রিস্ক ক্যাটাগরিতে, আর ২০৩১ নাগাদ এটা ভেরি হাই রিস্ক হয়ে যাবে যদি এভাবে চলে। আর আমরা? বিশ্বের মোট কার্বন নির্গমনে আমাদের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৫৬ শতাংশ। মানে, আমরা বিষ ছড়াইনি, কিন্তু তার ফল ভোগ করছি। এখন সেই মৃত্যু থেকে বাঁচতে হলে? ঋণ নিতে হচ্ছে।
২০০২ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত বাংলাদেশ জলবায়ু-সম্পর্কিত প্রকল্পে ঋণ নিয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু অনুদান পেয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন। ফলে, প্রতি এক ডলার অনুদানের জন্য আমরা তিন ডলারেরও বেশি ঋণ নিয়েছি। এটা যেন আপনার বাড়িতে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস এসে বলে, ‘নেভাতে পারি, কিন্তু পানির দাম সুদসহ দিতে হবে।’ আর আগুনটা? আপনার প্রতিবেশী ধরিয়েছে। এখন প্রতি বাঙালির মাথায় জলবায়ু-সম্পর্কিত ঋণের বোঝা প্রায় ৮০ ডলার, যা প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টাকা। একটা চার সদস্যের পরিবারে হিসাবটা হয়ে যায় ৩৮ হাজার টাকা। এই টাকায় একজন গ্রামের কৃষক কতটা সার কিনতে পারতেন? একজন জেলে কয়টা জাল? কিন্তু না, এটা চলে যাচ্ছে ঋণ শোধে, যা তারা নেননি, যে দূষণ তারা করেননি।
গ্রিন ফাইন্যান্সের আসল ফাঁদটা নামেই লুকিয়ে আছে। ‘সবুজ’ শুনলেই ভাবি ভালো কিছু, কিন্তু ভিতরে? বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়নের ৭২ শতাংশ আসে ঋণ হিসেবে। যেসব দেশ এরই মধ্যে দরিদ্র আর জলবায়ু-আক্রান্ত, তাদের ওপর আরও বোঝা চাপানো হচ্ছে। ২০২৩ সালে ৫৫টা জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ৪৭ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার শোধ করেছে ঋণের কিস্তিতে, কিন্তু সাহায্য পেয়েছে মাত্র ৩৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন। আমাদের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় ১১৩টা অগ্রাধিকার প্রকল্প আছে, যার জন্য ২০২৩ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত মোট ২৩০ বিলিয়ন ডলার লাগবে, যা প্রতি বছর গড়ে আট বিলিয়ন। কিন্তু এ পর্যন্ত যা জোগাড় হয়েছে তা এর একটা অংশও না। আর একটা মাঝারি ঘূর্ণিঝড়েই আমাদের ক্ষতি হয় প্রায় এক বিলিয়ন ডলার।
আরও খারাপ দিক হলো অস্বচ্ছতা। জাপান বাংলাদেশে কয়লা-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেমন মাতারবাড়ি প্রকল্পকে ক্লাইমেট ফাইন্যান্স বলে গণ্য করেছে, কারণ এতে কম দূষণকারী প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, প্রত্যেক ব্যাংককে মোট টার্ম লোনের কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ গ্রিন ফাইন্যান্সিং করতে হবে। কিন্তু ২০২১ সালে? মাত্র তিন শতাংশ। সুদের হার এত উঁচু যে ছোট উদ্যোক্তারা হাত দিতে চায় না। তাহলে এই ‘সবুজ’ টাকা আসলে কাদের জন্য? আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০৩৫ সাল নাগাদ বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেবে বলেছে। কিন্তু ২০২২ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলো শুধু ঋণের কিস্তি শোধ করেছে ৪৪৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। মানে প্রতিশ্রুত সাহায্য আসার আগেই পকেট খালি। আর বড় লক্ষ্য ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের, যার বেশিরভাগ আসবে বেসরকারি বিনিয়োগ হিসেবে। মানে মুনাফার জন্য, মানুষের জন্য নয়।
পাকিস্তানের সাবেক জলবায়ুমন্ত্রী শেরি রেহমান এটাকে ‘রিকভারি ট্র্যাপ’ বলেছেন। ঠিকই বলেছেন। আমরা যত খরচ করছি জলবায়ু মোকাবিলায়, তার চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে সুদে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রাস্তায় টাকা কমছে, যা আমাদের আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। বোস্টন ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, যদি জলবায়ু অর্থায়ন ঋণের বদলে অনুদান হতো তাহলে বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো থাকত। কিন্তু বাস্তবে? ২০২৩ সালে বহুজাতিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর তহবিলের ৬০ শতাংশ ছিল ঋণ। তত্ত্বে এক কথা, কাজে উল্টো। সমস্যা শুধু পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয় বরং কীভাবে আসছে সেটায়। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে অনুমোদিত প্রকল্পের মাত্র ৪৩ শতাংশ বাস্তবে বিতরণ হয়েছে। আবেদনের জটিলতা, অনুমোদনের দেরি, আরো নানা কারণে আটকে যাচ্ছে জরুরি প্রকল্প। আমলাতান্ত্রিক জালে হারিয়ে যাচ্ছে জনগণের সমস্যা।
তাহলে উপায় কী? প্রথমত, অর্থায়নের বেশিরভাগ অংশ অনুদান হতে হবে। যারা দূষণ করেনি, তাদের ওপর ঋণ চাপানো নৈতিকভাবে ভুল। এটা ক্ষতিপূরণ হওয়া দরকার। দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছতা আনতে হবে। কোথায় কত টাকা যাচ্ছে, কীভাবে খরচ হচ্ছে, সব হিসাব পরিষ্কার রাখতে হবে। কয়লা-প্রকল্পকে সবুজ বলে চালানোর ফাঁকি বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, নিজেদের ঘর গোছাতে হবে। ব্যাংকিংয়ে গ্রিন ফাইন্যান্সিং সহজ করে রিফাইন্যান্স সুবিধা বাড়াতে হবে যাতে সুদ কমে। চতুর্থত, স্থানীয় লেভেলে বিকেন্দ্রীকৃত অর্থায়ন দরকার। গ্রামীণ ব্যাংক যেমন ক্ষুদ্রঋণে বিপ্লব এনেছে, তেমনি মাইক্রো ফাইন্যান্সকে গ্রিনে যুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশ আসলে অসাধারণ কাজ করেছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার মডেল এখন বিশ্বে প্রশংসিত, লবণসহিষ্ণু ফসল তৈরি করেছি, ভাসমান কৃষি চালু, সাইক্লোন শেল্টার বানিয়েছি। কিন্তু এসব টেকসই করতে ন্যায্য অর্থায়ন লাগবে। গ্রিন ফাইন্যান্স যদি সত্যিকারের আলো হতে চায়, তাহলে এর চরিত্র পালটাতে হবে। এটা লেনদেন নয়, হতে হবে বৈশ্বিক দায়িত্ব। যারা শতাব্দী ধরে কার্বন ছড়িয়েছে, তাদের দায়িত্ব হবে—যারা পুড়ছে তাদের পাশে দাঁড়ানো। এটা হতে হবে বিনা শর্তে, বিনা সুদে, স্বচ্ছভাবে; নইলে এটা থেকে যাবে সবুজ রঙের ফাঁদ, যেখানে আটকে থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ। আর সেই ফাঁদ থেকে বেরোনোর পথ দিন দিন সরু হয়ে আসছে।
শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
